অগ্নিঝরা মার্চ
ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক থেকে বিরত থাকার আহ্বান
স্টাফ রিপোর্টার : একাত্তরের ১৮ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল থেকে বিভিন্ন সংগঠন মিছিল সহকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনের সামনে এসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিরত থাকার আহ্বান জানায় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা দাবি করে।
১৮ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খান কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি গঠনের ব্যাপারটি প্রত্যাখ্যান করে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। পরের দিন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশিত সেই বিবৃতির অংশ বিশেষ ছিল, ‘এ ধরনের কমিশন দিয়ে কোনও ফায়দা পাওয়া যাবে না। এ ধরনের তদন্তে আদৌ কোনও প্রকৃত তদন্ত হবে না, সত্যেও উপনীত হওয়া যাবে না। বরং এটা হবে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল মাত্র।’
শেখ মুজিব বলেন, এই তদন্ত কমিশন চাই নাই। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণকে এই তদন্ত কমিশনের সাথে কোনও সহযোগিতা না করার আহ্বান জানান তিনি। এইদিনে বঙ্গবন্ধু প্রতারণামূলক কমিশন প্রত্যাখ্যান করে তদন্তের জন্য নতুন কমিশন গঠন করেন। এদিন পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি ওয়ালী খান ঢাকায় আসেন। তিনি সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১ ঘণ্টা বৈঠক করেন। সে সময় তার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের ন্যাপ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
একাত্তরের ১৮ মার্চ সারাদিন ধরে মিছিলের পর মিছিল। বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ মুজিবেরর প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জানাতে এলে তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে বারবার উঠে এসে শোভাযাত্রাকারীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন, তোমরা চরম প্রস্তুতি নিয়ে ঘরে ঘরে সংগ্রামী দুর্গ গড়ে তোলো। যদি তোমাদের ওপর আঘাত আসে তা প্রতিহত করে শত্রুর ওপর পালটা আঘাত হানো। জনতাকে চূড়ান্ত লড়াইয়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ মুজিব বলেন, মুক্তিসংগ্রামের পতাকা আরো ওপরে তুলে ধরো। ৭ কোটি শোষিত-বঞ্চিত বাঙালির সার্বিক মুক্তি না আসা পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাও।
এদিনও বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক আসেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আরো সৈন্য আনা হচ্ছে, সে সম্পর্কে শেখ মুজিব কিছু জানেন কি না, বিদেশি সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার দেশের মাটিতে যা কিছু ঘটছে তার সব খবরই আমি রাখি। সাংবাদিকরা দেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাঙালি জাতি আজ জেগে উঠেছে। তারা স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে শিখেছে। জাগ্রত জনতার এই গণবিস্ফোরণকে স্তব্ধ করার শক্তি কোনও মেশিনগানের নেই।
আরও পড়ুন১৮ মার্চ রাতে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, পরদিন বেলা ১১টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ও আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে তৃতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
এদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তেজগাঁয়ে ও মহাখালীতে শ্রমিকদের ট্রাকে হামলা চালায়। সৈন্যরা এই দুই স্থানে নিরস্ত্র আরোহীদের নির্মমভাবে প্রহার করে এবং তাদের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। এসব ঘটনায় নগরীতে জনসাধারণের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। রাতে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, নিরস্ত্র মানুষের ওপর উস্কানিমূলক আচরণ, তা যে কোনো মহলেরই হোক না কেন, আমরা আর সহ্য করব না। এর ফলাফলের দায়িত্ব উস্কানিদাতাদেরই সম্পূর্ণ বহন করতে হবে।’ এদিকে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক গুলিবর্ষণ ও অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কে সরেজমিন তদন্তের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যায়।
অন্যদিকে করাচিতে ভুট্টো জানান, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে আলোচনার জন্য যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ঢাকা যাওয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের কাছে চাওয়া কয়েকটি বিষয়ের ব্যাখ্যা না পাওয়ায় তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1773772727.jpg)


_medium_1773761215.jpg)


_medium_1773773375.jpg)

_medium_1773750072.jpg)