ভিডিও মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রকাশ : ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৮ দুপুর

ঈদের বাজার অর্থনীতি: উৎসব না মৌসুমী মুনাফা

বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ হিসাবে ঈদ সকল মুসলিমের জন্য এক মহা আনন্দের দিন। এই দিনকে ঘিরে চলতে থাকে অনেকদিন ব্যাপী কেনাকাটা। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈদ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, কিছু শ্রেণীর মানুষের কাছে এটি একটি বিশাল মৌসুমী অর্থনৈতিক জোয়ার। বিশেষত রমজান এবং ঈদুল ফিতরকে ঘিরে যে কেনাকাটার ঢেউ উঠে তা অনেক খাতের ব্যবসায়ীদের সারা বছরের লাভ লোকসানের হিসাব বদলে দেয়। প্রশ্ন হলো এই এক মাসে আসলে কার ভাগ্য বদলায়? রমাদান হলো রহমতের, বরকতের মাস, আত্মত্যাগের মাস। এই মাসে সবকিছুতে ছাড় দেয়া উচিত ছিল যেন সর্বস্তরের মানুষের জন্য রমাদান আর ঈদ দুইটাই পালন যেন সহজ হয়ে যায়। সকল ধর্মপ্রাণ মুসল্লির রমাদান আর ঈদ পালনের সমান অধিকার রয়েছে। তাই এটা যেহেতু রহমত, বরকতের মাস যারা ব্যবসায়ী পর্যায়ের সকল মানুষের উচিত ছিল এইখানে ছাড়া দেয়া। কিন্তু তা না করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যেন সিন্ডিকেট ব্যবসায় মেতে উঠে। তারা রমজান আসার পূর্বেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে থাকে বাজারে মালামাল স্টক করে রেখে। রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে চড়া দাম রাখা হয়ে থাকে সকল পণ্যের। আর সাধারণ মানুষেরা বাধ্য হয় চড়া দামে কিনতে। 

ঈদের বাজারে সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র হলো অস্থায়ী দোকান,ফুটপাতের স্টল,হাট বাজারের বাড়তি ভিড়। ছোট কাপড় ব্যবসায়ী, দর্জি, জুতার দোকানদার, প্রসাধনী বিক্রেতা অনেকেই সারাবছর অপেক্ষা করেন এই মৌসুমের জন্য। অনেকে এক মাসেই বছরের বড় অংশের লাভ তুলে নেন। নতুন উদ্যোক্তারা ও অল্প পুঁজিতে সাময়িক ব্যবসা শুরু করেন। তাছাড়া গ্রাম গঞ্জের হাটেও বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবে ঝুঁকিও রয়েছে। অতিরিক্ত মাল তুললে, বিক্রি না হলে লোকসানের বোঝা বহন করতে হয় সারাবছর। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর হলেও ঈদের আগে দেশীয় বাজারেও বড় চাহিদা তৈরি হয়। বড় শপিংমল থেকে শুরু করে স্থানীয় মার্কেট-সবখানেই নতুন কালেকশনের ধুম। ঢাকার নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি বা চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা - প্রতিটি বাজারে ভিড় উপচে পড়ে। ফলে পাইকারি থেকে খুচরা পুরো সাপ্লাই চেইন সচল থাকে।

ঈদের আগে প্রবাসীরা বেশি করে টাকা পাঠায়। ফলে গ্রামে নগদ প্রবাহ বাড়ে। কৃষক পরিবার, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার সবাই কিছুটা স্বস্তি পায়। এই সময়ে ইলেকট্রনিক্স বিক্রি বাড়ে, ফার্নিচার ও গৃহসামগ্রীর চাহিদা বাড়ে এবং গ্রামীণ বাজারে লেনদেন বাড়ে। সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ে যেই বিষয়টা তা হলো পরিবহন খাত। যেন অতিরিক্ত চাপ ও অতিরিক্ত আয়; বিষয়টা যেন সমানুপাতিক হারে বাড়ে। বাস, লঞ্চ, ট্রেন-সবখানে টিকেটের চাহিদা তুঙ্গে। অতিরিক্ত ট্রিপ, বিশেষ সার্ভিস-সবমিলিয়ে পরিবহন খাত বড় আয় করে থাকে। তবে এর সঙ্গে থাকে ভাড়া বৃদ্ধি, ভোগান্তি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা ও ই-কমার্স  ঈদের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাড়িতে বসেই কেনাকাটা এটি এখন বড় শহর থেকে জেলা শহরেও জনপ্রিয়। ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে ফিনটেক খাতও লাভবান হয়। 

কিন্তু সবার ভাগ্য কি বদলায়? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। দিনমজুরের আয় সাময়িকভাবে বাড়লেও স্থায়ী নিরাপত্তা তৈরি হয়না। অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ তার পরিবারের ঈদের খরচ মেটাতে ঋণ নেয়। বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় চাপ বাড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। অর্থাৎ এক মাসের উৎসব অর্থনীতি যেমন মানুষের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়,তেমনি অনেকের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপও  তৈরি করে। ঈদের বাজার অর্থনীতি মূলত একটি “ মৌসুমী বুস্ট” যা সাময়িকভাবে চাঙ্গা করে ব্যবসা বাণিজ্য। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, খুচরা ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় সুযোগ। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার সারাবছরের স্থিতিশীল আয় ও ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা। ঈদের আনন্দ যদি অর্থনৈতিক সাম্যও নিয়ে আসে - তবেই সত্যিকারের সার্থক হবে এই উৎসব।

 

আরও পড়ুন

লেখক :

তানিয়া আক্তার

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঈদের বাজার অর্থনীতি: উৎসব না মৌসুমী মুনাফা

বাহরাইনে মার্কিন এয়ার বেসে ইরানের হামলা

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রিটের আদেশ আজ

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল -শিবিরের সংঘর্ষ: নিন্দা জানালো ঢাবি ছাত্রশিবির 

বগুড়ার কমল থেকে বিশ্ব মানবতার জিয়াউর রহমান

ঈদযাত্রার বাস-ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু