ভিডিও রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রকাশ : ০১ মার্চ, ২০২৬, ০৪:৪৯ দুপুর

অশান্ত ডুরান্ড লাইন: পাকিস্তান-আফগান সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বর্তমান সহিংসতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং অমিমাংসিত নিরাপত্তা উদ্বেগের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও, ২০২৬ সালের এই বসন্তে এসে সীমান্ত আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ডুরান্ড লাইনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংঘাত এখন কেবল একটি সীমান্ত বিতর্ক নয়, বরং এটি সন্ত্রাসবাদ ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে।

ঐতিহাসিক ফাটল ও ডুরান্ড লাইনের রাজনীতি

এই সংকটের মূলে রয়েছে ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ডুরান্ড লাইন’। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে নির্ধারিত এই সীমানাকে আফগানিস্তান কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের দাবি, এই রেখাটি পশতুন জাতিকে অন্যায়ভাবে বিভক্ত করেছে। ২০২১ সালে তালেবানের দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় আরোহণের পর পাকিস্তান আশা করেছিল একটি ‘বন্ধুসুলভ’ সীমান্ত পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, আদর্শিক মিল থাকলেও জাতীয়তাবাদী প্রশ্নে তালেবান তাদের পূর্বসূরিদের মতোই অনমনীয়। ফলে ডুরান্ড লাইনের কাঁটাতার ও নিরাপত্তা চৌকি নিয়ে দুই বাহিনীর মধ্যে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

টিটিপি ফ্যাক্টর ও কাবুলের দোটানা

পাকিস্তানের প্রধান অভিযোগ হলো, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগান ভূখণ্ডকে অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গোষ্ঠীটির সাথে আফগান তালেবানের গভীর সামাজিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে আমরা দেখছি, কাবুল এখানে একটি ‘নিরাপত্তা উভয়সংকটে’ (ঝবপঁৎরঃু উরষবসসধ) রয়েছে। তারা যদি টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তবে টিটিপির যোদ্ধারা তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স’ (আইএসকেপি)-এ যোগ দিতে পারে। এই ভয়েই তালেবান কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী টিটিপি দমনে কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। বিপরীতে, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও খনিজ সমৃদ্ধ বেলুচিস্তানে বিএলএ-এর ক্রমবর্ধমান হামলা পাকিস্তানকে ‘অধিকতর আক্রমণাত্মক’ কৌশল গ্রহণে বাধ্য করেছে।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনীতি

আরও পড়ুন

এই সংঘাতের ঢেউ কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভারত এই হামলার নিন্দা জানিয়ে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, ইরান ও রাশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ প্রকাশ মূলত এই বার্তাই দেয় যে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা পুরো অঞ্চলের শরণার্থী সমস্যা ও জঙ্গিবাদকে উসকে দেবে। পাকিস্তানের বর্তমান সামরিক কৌশল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা এখন কেবল সীমান্তে রক্ষণাত্মক নয়, বরং আফগান ভূখণ্ডের ভেতরে গিয়ে হামলা চালাতেও দ্বিধা করবে না। এটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যেমন বিতর্কিত, তেমনি দুই ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বড় ফাটল।

সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ডুরান্ড লাইনের অস্থিরতা কমাতে হলে ইসলামাবাদ ও কাবুলকে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। পাকিস্তানকে বুঝতে হবে যে, দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আরও ভঙ্গুর করবে; আর তালেবানকে উপলব্ধি করতে হবে যে, প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। রমজান মাসে এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করে কাতার বা তুরস্কের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে একটি টেকসই রাজনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছানোই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ডুরান্ড লাইন কেবল একটি সীমানা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক অশান্তির স্থায়ী অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে।

হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক

 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অশান্ত ডুরান্ড লাইন: পাকিস্তান-আফগান সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট

পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের বিমান হামলা

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ পেছানো 

ইরানে একদিনে ১২শ’ বোমা ফেলেছে ইসরায়েল

মুক্তাগাছায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত ১৫

সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য নিয়ে গন্তব্যে একটি ট্রাক