আজ বাংলা ইশারা ভাষা দিবস
আর্ট কলেজে রঙের ভাষায় কথা বলে সনি কিন্তু সেই ভাষা বোঝে না সাধারণ মানুষ
হাফিজা বিনা : বগুড়ার আর্ট কলেজের করিডোরে রং-তুলি হাতে নিমগ্ন থাকে হাবিবুর রহমান সনি। ক্যানভাসে তার নিপুণ আঁচড় আর জাদুকরী হাতের কাজ দেখে যে কেউ থমকে দাঁড়াবে। তবে এই সৃজনশীলতার আড়ালে রয়ে গেছে এক গভীর নি:শব্দতা। সনি জন্ম থেকেই বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। সনি এখন উচ্চশিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করলেও পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। এর প্রধান কারণ তার অসাধারণ হাতের কাজ বা ইশারা ভাষা নয়, বরং সাধারণ মানুষের তার এই ইশারা ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা। বেশিরভাগ মানুষ তাতে ভিন্ন অর্থ বের করে এবং তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য করে। অনেকে বোঝেই না যে শব্দছাড়াও ভাষা হয়। কথাগুলো বলছিলেন সনির বড় বোন বগুড়া টিএমএসএস অটিজম ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মৌসুমী সুলতানা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ৪৬ কোটি মানুষ আছে যারা কানে শুনতে পান না। এই বিপুল সংখ্যক শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বেশিরভাগই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাস করেন। এদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত বাক ও শ্রবন প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার ৩৯৪ জন। বিশ্বের এই বিপুল সংখ্যক মানুষদের অধিকার আরও দৃঢ় করতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস বা সাংকেতিক ভাষা দিবস পালনের অনুমতি দেয়। আর আমাদের দেশে ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৭ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ বছর বাংলা ইশারা ভাষা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ইশারা ভাষার ব্যবহার, বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার’।
কিন্তু প্রতিবছর ৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ‘বাংলা ইশারা ভাষা দিবস’ পালিত হলেও সনির মতো হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সেই বার্তার প্রতিফলন সামান্যই। সনি তার মনের ভাব প্রকাশ করতে চায় ইশারায়, কিন্তু তার চারপাশের অধিকাংশ মানুষই সেই ভাষা বোঝেন না। ফলে একধরনের অদৃশ্য দেয়াল তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ইশারা ভাষা কেবল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষা যা সবার জানা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণ বাড়ানো জরুরি। সনির মতো প্রতিভাবানরা যাতে কেবল তাদের প্রতিবন্ধকতার কারণে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য সাধারণ পাঠ্যপুস্তক বা কর্মক্ষেত্রে ইশারা ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।
আরও পড়ুনবগুড়া শহরের চক সুত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা এই উদীয়মান শিল্পী সনি প্রমাণ করেছেন যে, শোনার বা বলার ক্ষমতা না থাকলেও মেধা দিয়ে অনেক দূর যাওয়া সম্ভব। ছোটবেলা তেকে এই ভাষার জন্য অনিক প্রতিক’ল অবস্থায় তাকে পড়তে হয়েছে। পরবর্তীতে বগুড়ার একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়ালেখার সুবাদে ইশারা ভাষা শিখেছে সে। বগুড়ার অনেক প্রতিবন্ধী স্কুল থাকলেও ইশারা ভাষা শেখানো প্রায় প্রতিটি স্কুলেই উপেক্ষিত। ইশারা দিয়েই সনি জানায়, প্রতিটি স্কুলে এই ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত। তাহলে তারাও স্বাভাবিকভাবে সমাজে সবার সাথে মিশতে পারবে। এখন প্রয়োজন কেবল একটু সহমর্মিতা আর ইশারা ভাষার সঠিক মূল্যায়ন, যাতে সনিদের কথা আর অসম্পূর্ণ না থাকে।
বগুড়া টিএমএসএস অটিজম ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মৌসুমী সুলতানা বলেন, মানব ইতিহাসের প্রথম ভাষার নাম ‘ইশারা ভাষা’। একে সকল ভাষার মাতৃভাষা বলেও অভিহিত করা যায়। কিন্তু বিশ্বের শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের ভাব বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম ইশারা ভাষাকে আমরা অবজ্ঞা অবহেলা করে আসছি। তাই সার্বিক বিবেচনায় সমাজের সকলকে নিজ প্রয়োজনে এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে ইশারা ভাষা শেখা খুবই প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন







