শিশুদের কি বড়দের মতো চা-কফি পান করা উচিত
সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা বা কফি-অনেক পরিবারের কাছে এটাই দিনের শুরু। বড়রা যখন চায়ের কাপে চুমুক দেন, তখন শিশুদেরও কৌতূহল জাগে। কেউ স্বাদ নিতে চায়, কেউ আবার বড়দের মতো কাপ হাতে নিয়ে বসতে পছন্দ করে। কিন্তু এই পরিচিত অভ্যাস শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে ভাবেন কি?
চা-কফি বড়দের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। এসব পানীয়তে থাকা ক্যাফেইন ঘুম, মনোযোগ ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ছোটদের হাতে চায়ের কাপ তুলে দেওয়ার আগে বয়স, পরিমাণ এবং পান করার সময়-সবকিছু বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
চা-কফিতে থাকা ক্যাফেইন কী করে?
ক্যাফেইন একটি প্রাকৃতিক উদ্দীপক উপাদান, যা চা ও কফির পাশাপাশি কোলা, চকলেট এবং কিছু এনার্জি ড্রিংকেও পাওয়া যায়। এটি সাময়িকভাবে ঘুমভাব কমিয়ে সতর্ক থাকতে সাহায্য করতে পারে। তবে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য ক্যাফেইন অপরিহার্য কোনো পুষ্টি উপাদান নয়।
কিন্তু এটা কোনো খাবারের উপাদান নয়। ক্যালসিয়াম বা আয়রনের মতো শরীররে প্রয়োজন নেই। শিশুদের শরীরের ওজন কম হওয়ায় একই পরিমাণ ক্যাফেইন তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণে অস্থিরতা, হাত কাঁপা, বুক ধড়ফড়, মাথাব্যথা, পেটের অস্বস্তি এবং ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বয়স অনুযায়ী কতটা ক্যাফেইন?
শিশু-কিশোরদের জন্য ক্যাফেইন গ্রহণের বিষয়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কানাডার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় চার থেকে ছয় বছর বয়সীদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ৪৫ মিলিগ্রাম, সাত থেকে নয় বছর বয়সীদের জন্য ৬২ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম এবং ১০ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য ৮৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইনের সীমা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই সংখ্যাগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদে পান করার লক্ষ্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস শিশুদের ক্যাফেইন গ্রহণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। তাই বিশেষ করে ছোট শিশুদের নিয়মিত চা-কফি দেওয়ার অভ্যাস না করাই ভালো।
এক কাপেই কতটা ক্যাফেইন থাকে?
চা বা কফিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ নির্ভর করে পানীয়ের ধরন, পরিমাণ এবং তৈরির পদ্ধতির ওপর। এক কাপ চায়ে কয়েক দশ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে। অন্যদিকে এক কাপ কফিতে এর পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। বড় মগের কফি বা ঘন করে তৈরি পানীয়তে ক্যাফেইনের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
এনার্জি ড্রিংকের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো কোনো ক্যানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যাফেইন থাকে। কোলা, চকলেট এবং ক্যাফেইনযুক্ত কিছু ওষুধ থেকেও শরীরে এই উপাদান প্রবেশ করতে পারে। ফলে শুধু চা বা কফির হিসাব রাখলেই সব সময় চলে না।
আরও পড়ুনঘুমের ওপর পড়ে বড় প্রভাব
শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাফেইন শরীরে কয়েক ঘণ্টা সক্রিয় থাকতে পারে, এর প্রভাব অনেকের ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিকেল বা সন্ধ্যায় চা-কফি পান করলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে কিংবা ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।
ঘুম কম হলে পরদিন পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা, খেলাধুলা করা এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পরীক্ষার আগে জেগে থাকার জন্য কফি পান করাও ভালো কৌশল নয়। কারণ পর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতি ও শেখার প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চা-কফি সরাসরি উচ্চতা কমিয়ে দেয়-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। তবে ক্যাফেইনের কারণে নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত হলে তা শিশুর সামগ্রিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিকল্প হিসেবে কী দেওয়া যায়?
ছোট শিশুদের নিয়মিত চা-কফি না দিয়ে পানি ও বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত দুধ দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। কিশোরদের ক্ষেত্রেও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়কে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত না করাই শ্রেয়। বিশেষ করে এনার্জি ড্রিংক শিশু-কিশোরদের দেওয়া উচিত নয়।
ভেষজ চায়ে সাধারণত ক্যাফেইন থাকে না, তবে সব পণ্যের উপাদান এক নয়। তাই লেবেল দেখে নেওয়া জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ভেষজ পানীয় নিয়মিত দেওয়ার আগে বয়স ও উপযোগিতা বিবেচনা করা উচিত।
শিশুদের সামনে বড়দের চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস দেখে তারা যেন সেটিকে বড় হওয়ার অপরিহার্য অংশ মনে না করে। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত খেলাধুলা এবং পর্যাপ্ত পানি-সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। সকালের চায়ের সুবাস থাকুক ঘরে, তবে ছোটদের কাপে তা তুলে দেওয়ার আগে ভাবুন তাদের বয়স ও স্বাস্থ্যের কথা।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, টাইম ম্যাগাজিন
মন্তব্য করুন









