বগুড়ায় সরকারি হাসপাতালের পাশেই বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের ছড়াছড়ি
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে কানের সমস্যা নিয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন চল্লিশোর্ধ মঞ্জুরী বেগম। স্বামী হাবিলের সঙ্গে হাসপাতালের গেটে পা দিতেই তারা দালালের খপ্পড়ে পড়েন। দালাল তাদের জানায় আজ হাসপাতালে কানের ডাক্তার বসবে না, পাশে একটি ক্লিনিকে ভালো ডাক্তার আছেন।
দালালের কথামতো পাশের ক্লিনিকে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ করেন তারা। ডাক্তার এক সপ্তাহ পর আবার ওই ক্লিনিকে তাদের যেতে বলেন। বিষয়টি মঞ্জুরী যে বাড়িতে গৃহ সহায়কের কাজ করেন, সেই বাড়ির গৃহকর্তীকে জানালে তিনি বলেন, তেমামরা দালালের খপ্পড়ে পড়েছো। পরবর্তীসময়ে ওই নারীর সহায়তায় আবারও শজিমেক হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন মুঞ্জুরি বেগম।
বগুড়ায় ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে শতশত বেসরকারি বসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বগুড়া শজিমেক হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোর আশে-পাশে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানে রোগী ভাগিয়ে আনতে এক শ্রেণির দালাল সব সময় হাসপাতাল গেটের পাশেই অবস্থান করেন।
কম লেখাপড়া জানা বা বোকাসোকা রোগী দেখলেই তারা বিভিন্ন তালবাহানা করে এসব চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রে নিয়ে আসে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৫০২টি।
তবে এই ৫০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র বর্তমানে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। জনবল সংকট, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ত্রুটি কিংবা প্যাথলজিক্যাল যন্ত্রপাতি অকেজো হওয়ার কারণে এই কেন্দ্রগুলোতে এখন আর চিকিৎসাসেবা বা রোগ নির্ণয়ের কার্যক্রম চালু নেই।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার ৫০২টি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৪০টি চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে কেবল বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে দুই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে। বিশেষ করে শহরের শেরপুর রোড, ঠনঠনিয়া, মফিজ পাগলার মোড়, রহমান নগর এবং কলোনি এলাকাতেই এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শহরের সুত্রাপুর, চেলোপাড়া, মালতিনগর, কাটনারপাড়া ও তিনমাথা অঞ্চলেও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর উচ্চ ঘনত্ব রয়েছে।
এছাড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল সংলগ্ন সিলিমপুর রোড ও এর আশেপাশের এলাকায় নিবন্ধিত বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যা ৩৯টি। নীতিমালা লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় চিত্র দেখা গেছে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়।
আরও পড়ুনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের ১ কিলোমিটার সীমানার মধ্যে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক স্থাপন করা নিষেধ। একই সাথে এই দূরত্বের মধ্যে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অথচ বগুড়ার শজিমেক হাসপাতালের ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩৯টির মতো বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালের সন্নিকটে এই নিয়ম অমান্য করায় মঞ্জুরী বেগমের মতো সাধারণ রোগীরা দালাল চক্রের খপ্পড়ে পড়ছেন। তারা সরকারি চিকিৎসাসেবা ছেড়ে উচ্চ ব্যয়ের প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে শেরপুর, দুপচাঁচিয়া ও শিবগঞ্জ উপজেলা। উপজেলা পর্যায়ে একই অবস্থা। সরকারি হাসপাতালগুলোর আশে-পাশেই অধিকাংশ বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে। দুপচাঁচিয়া ও শেরপুর উপজেলার হাসপাতাল রোড এবং শিবগঞ্জের মোকামতলা ও কিচক বাজার এলাকাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে।
এর বিপরীতে ধুনট, নন্দীগ্রাম, কাহালু, গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার মতো প্রান্তিক এলাকাগুলোতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই মূলত রোগ নির্ণয় কেন্দ্র বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে এই তালিকায় সাধারণ চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানও লাইসেন্স পেয়েছে।
বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. ফারজানুল ইসলাম নির্ঝর বলেন, “বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ধরনেরই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক বা হাসপাতাল গড়ার নিয়ম নেই। তারপরও বগুড়াসহ সারাদেশেই এই প্রবণতা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটার সীমানার মধ্যে থাকা বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার।
একই সঙ্গে এই সীমানার মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিক স্থাপনের অনুমতিও আর দেওয়া হচ্ছে না। যেগুলো রয়েছে সেগুলো আগে থেকই আছে। তবে নতুন করে আর দেওয়া হবে না। বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ডা. ফারজানুল বলেন, অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়েও মূলত তিনটি কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। যেমন-কোনো কোনো ক্লিনিক মালিক চালাতে না পেরে নিজেই ক্লিনিক বন্ধ করেছেন, দ্বিতীয়ত; ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন না করায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ওইসব ক্লিনিক ও হাসপাতালের নাম বন্ধ রয়েছে ,তৃতীয়ত: অভিযোগের ভিত্তিতে বা ভ্রাম্যামাণ আদালত গিয়ে অসঙ্গতি কোনো কিছু দেখতে পেলে সিলগালা করার মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মন্তব্য করুন







