ভিডিও বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১১ এএম

সুরাইয়া বিনতে হাসান

অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকা নগরীর দুর্ভোগ

অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকা নগরীর দুর্ভোগ

ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মহানগরগুলোর একটি। কিন্তু এই শহরের দ্রুত বৃদ্ধি যেমন সুযোগ এনেছে, তেমনি এনেছে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ তার মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। উন্নয়নের বঝলকানির আড়ালে ঢাকা আজ হোঁচট খাচ্ছে একটি পুরনো সমস্যায়, অকার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেমে।

বর্ষাকাল এলেই ঢাকার চিত্র বদলে যায়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহরের রাস্তাঘাট, গলি, এমনকি প্রধান সড়ক পর্যন্ত ডুবে যায় হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানিতে। কারণ স্পষ্ট, শহরের অধিকাংশ ড্রেনেজ সিস্টেম পুরোনো, অপরিকল্পিত ও রক্ষণাবেক্ষণহীন। ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন মিলে প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার ড্রেন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। কিন্তু এই ড্রেনগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশই নিয়মিত পরিষ্কার হয় না। অনেক জায়গায় ড্রেন ভরাট হয়ে গেছে আবর্জনা, পলিথিন ও ময়লায়। 

ঢাকার প্রাকৃতিক জলাধার, খাল ও নালা একসময় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ ছিল, কিন্তু এখন অধিকাংশই দখল বা ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি বের হতে না পেরে শহরের রাস্তায় জমে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৭,৫০০ থেকে ৮,০০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ বর্জ্য দুই সিটি করপোরেশন (উত্তর ও ও দক্ষিণ) বিভিন্নভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করে। বাকি বর্জ্য পড়ে থাকে খাল, নালা, রাস্তার পাশে বা উন্মুক্ত স্থানে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি সৃষ্টি করে। 

ড্রেনেজ বিপর্যয়ের ফলে অনেক সময় বৃষ্টির পানি জমে থেকে শুধু যানজট নয়, বাড়ায় ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েডের মতো রোগের ঝুঁকি। রাস্তা নষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হয়, সময় ও শ্রম নষ্ট হয় অর্থাৎ এ এক অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট। এ সমস্যার মূলে রয়েছে পরিকল্পনাহীন নগর বৃদ্ধি, খাল ও জলাধার দখল, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। এগুলো মিলেই ঢাকাকে প্রতিদিন এক অচল নগরীতে পরিণত করছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য এখন থেকেই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। খাল পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করতে হবে। 

ঢাকার দখলকৃত খালগুলো উদ্ধার করতে হবে এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ । ওয়াসার "ঢাকা ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ২০৩০" প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্লাস্টিক ও পলিথিনই এখন ড্রেন ব্লক হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। নিয়মিত পরিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মাসিক ড্রেন পরিদর্শন ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রযুক্তি ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। স্মার্ট সেন্সর বা মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে ড্রেনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। 

আরও পড়ুন

সর্বোপরি, জনসচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ বাড়ানো প্রয়োজন। সুইডেন এখন প্রায় শূন্য বর্জ্য দেশ তারা তাদের বর্জ্যের ৯৯% পুনর্ব্যবহার বা শক্তিতে রূপান্তর করে। জাপান-এ প্রতিটি নাগরিক বর্জ্য ১০-১২ ভাগে ভাগ করে ফেলে, এবং কঠোর আইনের মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের সাফল্যের মূল রহস্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ব্যবহার, এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ। ঢাকার বর্জ্য এখন শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, এটি পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার প্রশ্ন। আমাদের আগামী দিনের জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে প্রতিটি পরিবারে বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র গঠন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং স্কুল পর্যায় থেকেই 'পরিবেশ শিক্ষা' চালু করা। কারণ, রাস্তার পাশে ময়লা ফেলে কোনো শহর সভ্য হতে পারে না।

সভ্যতা শুরু হয় নিজের দায়িত্ব পালন থেকে একটি প্লাস্টিক বোতল সঠিক জায়গায় ফেলা থেকেই টেকসই শহরের শুরু। ঢাকার ড্রেনেজ সমস্যা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, আবার একদিনে এর সমাধানও সম্ভব নয়। তবে সমন্বিত উদ্যোগ, নাগরিক সচেতনতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনা থাকলে এই শহর আবারও শ্বাস নিতে পারবে। উন্নয়নের আলো তখনই টেকসই হবে, যখন ঢাকার রাস্তায় নয় ড্রেনে পানি স্বাভাবিকভাবে চলবে। এখনই সময় দায়িত্ব নেওয়ার সরকার, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে, যেন ঢাকা সত্যিই "জলাবদ্ধতার শহর” নয়, “সমাধানের শহর” হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
suraiyabintehasan12@gmail.com

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকা নগরীর দুর্ভোগ

১

মেসির সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন ওতামেন্দিও

২

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৬৫

৩

বিদায়ী ম্যাচে মেসিকে লাল ও হলুদ কার্ড দিলেন রেফারি

৪

কৃষ্ণসাগরে ড্রোন হামলায় তেলবাহী জাহাজে আগুন

৫

গোল-অ্যাসিস্টে মহাকাব্যের শেষ পৃষ্ঠা লিখে মেসির বিদায়

৬