বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান বাদী হয়ে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
পি কে হালদারসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের সাবেক পরিচালক মো. নওশেরুল ইসলামসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
নওশেরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ১৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলাগুলোতে নওশেরুল ইসলামকে পি কে হালদারের সহযোগী হিসেবে আসামি করা হয়েছে।
দুদকে পাওয়া অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে নওশেরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেওয়া হয়।
এজাহার অনুযায়ী, সম্পদ বিবরণীতে নওশেরুল ইসলাম ১০৬টি দলিলের মাধ্যমে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬১ টাকা মূল্যের জমি এবং অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ ১ কোটি ৩৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা—সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৮২ লাখ ৮২ হাজার ৮৬১ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদের তথ্য দেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, এফডিআর, ডিপিএস, বীমা, সঞ্চয়পত্র, জুয়েলারি, আসবাবপত্র, পেনশন স্কিম, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা টাকা ও নগদ অর্থসহ মোট ১৯ কোটি ৯৩ লাখ ৬৭ হাজার ৭১২ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ কোটি ৮৫ লাখ ৪১ হাজার ৬৭১ টাকা।
অনুসন্ধানের সময় নওশেরুল ইসলাম সংশোধিত সম্পদ বিবরণী দাখিল করে জমি বিক্রির অগ্রিম বাবদ ১৩ কোটি ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪৭ টাকা পাওনা থাকার কথা জানান। এজাহারে ওই দায়-দেনা বাদ দিয়ে তার নিট সম্পদের পরিমাণ ১২ কোটি ৭১ লাখ ৭৫ হাজার ২৪ টাকা হিসাব করা হয়।
এর সঙ্গে ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০২২-২০২৩ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর নথিতে পাওয়া ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৭০ হাজার ১৩০ টাকা পারিবারিক ব্যয় যোগ করে তার নামে অর্জিত মোট সম্পদের মূল্য ১৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৫ হাজার ১৫৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
আরও পড়ুনঅন্যদিকে, একই সময়ে আয়কর নথি পর্যালোচনা করে ভাতা, ব্যবসা, ফার্ম/খামার, কৃষি, নিরাপত্তা জামানতের সুদ, করমুক্ত আয়, অন্যান্য উৎস, বাড়িভাড়া, অন্যান্য প্রাপ্তি, মৎস্য, বোনাস শেয়ার, ব্যাংক সুদ, জমি বিক্রি ও জীবনবীমাসহ বিভিন্ন খাত থেকে মোট ১২ কোটি ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৫৪ টাকা বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায়।
এজাহারে বলা হয়েছে, অর্জিত মোট সম্পদ ও পারিবারিক ব্যয়ের বিপরীতে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ বাদ দিলে ৫ কোটি ১৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদ নওশেরুল ইসলামের জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। দুদকের অভিযোগ, তিনি অসাধু উপায়ে ওই সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখেছেন।
এ ছাড়া সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ে নড়াইলের লোহাগড়া থানার ইতনা মৌজায় ৪৩৯২ নম্বর দলিলে ২০০৭ সালের ২০ জানুয়ারি কেনা ১০৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় ৪০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দেখান নওশেরুল ইসলাম। তবে নড়াইল গণপূর্ত বিভাগের নিরপেক্ষ প্রকৌশলীর পরিমাপে ওই অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় ৪১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৮ টাকা পাওয়া যায়। এতে ৯১ হাজার ৯৮ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য তিনি গোপন করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, সম্পদ বিবরণীতে বনানী ডিওএইচএসের গ্রিন হ্যাভেনে স্ত্রীসহ যৌথ মালিকানায় থাকা ২ হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটে নিজের বিনিয়োগ ৩০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা দেখান নওশেরুল ইসলাম। যাচাইয়ে দেখা যায়, ফ্ল্যাটটি কেনার জন্য ২০০৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০০৬ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন লিমিটেডকে ৭৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এতে তার অংশের ব্যয় ৩৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা হওয়ায় সম্পদ বিবরণীতে ৮ লাখ টাকা কম দেখানো হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এভাবে মোট ৮ লাখ ৯১ হাজার ৯৮ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ঘোষণা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে নওশেরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এজাহারে বলা হয়েছে, সম্পদ বিবরণীতে সম্পদের তথ্য গোপন, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ঘোষণা এবং জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৫ কোটি ১৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
নওশেরুল ইসলামের কর্মজীবন
মো. নওশেরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করার পর ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। প্রায় ১৫ বছর চাকরি করার পর ১৯৯৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বিভাগে পরিচালক থাকা অবস্থায় চাকরিজীবন শেষ করেন।
এরপর মেসার্স মেরিন অ্যান্ড মেরিন লিমিটেড কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক হন।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








