ভিডিও বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০২:২৬ পিএম

অনলাইন প্রতারণা বাড়ছে, পণ্য পেয়ে হতাশ হচ্ছেন ক্রেতারা

অনলাইন প্রতারণা বাড়ছে, পণ্য পেয়ে হতাশ হচ্ছেন ক্রেতারা

শেখ শাহরিয়ার হোসেন : অনলাইনে পণ্য কিনতে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে ব্যবহার করা হচ্ছে নানা ধরনের চমক। কখনো 'মিস্ট্রি বাক্স', আবার কখনো বিক্রেতার ধর্মীয় পরিচয়। বিজ্ঞাপনে দেখানো আকর্ষণীয় পণ্য কিংবা বড় ছাড়ের আশ্বাসে অর্ডার করে পার্সেল হাতে পাওয়ার পর হতাশ হওয়ার অভিযোগ করছেন অনেক ক্রেতা। বিশেষ করে 'মিস্ট্রি বাক্সে' কী পণ্য দেওয়া হবে, তা আগে থেকে স্পষ্ট না থাকায় পণ্যের মান ও বাজারমূল্য যাচাইয়ের সুযোগও থাকে না। 

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় পোশাক ও বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থাপন করা কিছু পণ্য কেনার পর মান ও দামের সঙ্গে প্রত্যাশার মিল না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনলাইন বেচাকেনায় পণ্যের তথ্যের পাশাপাশি বিক্রেতার ক্ষেত্রেও পরিচয়ের ওপর আস্থা রেখে ক্রেতার বিশ্বাসকে বিপণনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। 

অনলাইন কেনাকাটার বড়  হলো, পণ্য কেনার আগে সেটি হাতে নিয়ে দেখা বা মান যাচাই করার সুযোগ থাকে না। ছবি, ভিডিও, বিক্রেতার বক্তব্য এবং অন্য ক্রেতার রিভিউ দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই জায়গাটিই কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে অসাধু বিক্রেতাদের। কোনো পণ্যের ছবি হয়তো আকর্ষণীয়, বর্ণনায় দেওয়া হচ্ছে উন্নতমানের উপকরণ ব্যবহারের কথা। কিন্তু পার্সেল খুলে ক্রেতা দেখছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। পণ্যটি নিম্নমানের, আকার বা রঙের সঙ্গে ছবির মিল নেই কিংবা বিজ্ঞাপনে বলা বৈশিষ্ট্যই নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক অনলাইন ব্যবসার একটি অংশে বিক্রেতার ধর্মীয় পরিচয়ও পণ্য বিক্রির প্রচারে ব্যবহার করা হচ্ছে। 

লম্বা দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি বা ইসলামি পোশাক পরে পণ্যের প্রচার, ধর্মীয় বক্তব্যের সঙ্গে পণ্যের বিজ্ঞাপন কিংবা 'হালাল', 'সুন্নাহ' ও 'মাশআল্লাহ' ধরনের শব্দ ব্যবহার করে ক্রেতার আস্থা অর্জনের চেষ্টা দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে সমস্যা ধর্মীয় পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ে নয়। সমস্যা তখনই, যখন ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়কে পণ্যের মান বা ব্যবসায়িক সততার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কারণ একজন বিক্রেতা দেখতে বা আচরণে যতই ধার্মিক হোন, সেটি তার বিক্রি করা পণ্যের গুণগত মানের নিশ্চয়তা নয়। 

ঢাকার এক অনলাইন ক্রেতা রাকিব হাসান বলেন, আমি সাধারণত অনলাইনে পণ্য কেনার আগে অনেক যাচাই করি। কিন্তু কিছু পেজের উপস্থাপন দেখে মনে হয়েছিল মানুষটি বিশ্বাসযোগ্য। তাই বেশি কিছু না দেখে অর্ডার করি। পরে দেখি, পণ্যের মান অনুযায়ী দাম অনেক বেশি। 

শরিফ সিরাজ নামে আরেক ক্রেতা বলেন, একই জিনিস অন্য জায়গায় কম দামে পাওয়া যায়। কিন্তু বিক্রেতার ধর্মীয় পরিচয় দেখে মনে হয়েছিল তিনি হয়তো ভালো পণ্য দেবেন। পরে বুঝেছি, পরিচয় আর পণ্যের মান এক বিষয় নয়।

এদিকে অনলাইন কেনাকাটায় প্রচলিত 'মিস্ট্রি বক্স' এ ক্রেতা জানেন না ভিতরে কী থাকবে। ফলে পণ্যের প্রয়োজনীয়তা, মান কিংবা বাজারমূল্য কেনার আগে যাচাই করা কঠিন। ক্রেতা যদি বাক্সের ভেতরের পণ্যের সম্ভাব্য ধরন, মূল্যমান বা রিটার্নের শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য না পান, তাহলে অফারটি কতটা স্বচ্ছ, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষ করে 'মিস্ট্রি বাক্সের' মতো পণ্যে ক্রেতা যখন কেনার আগেই জানেন না তিনি ঠিক কী কিনছেন, তখন মূল্য ও মান যাচাইয়ের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যায়। 

এ বিষয়ে রানা মাসুদ নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পণ্যের ছবিসহ লেখেন, দারাজের মতো বড় একটি প্ল্যাটফর্মে 'মিস্ট্রি বাক্স'-এর নামে ৫১০ টাকা মূল্যের কথা বলে ৫০ টাকার পণ্য দেওয়ার অভিযোগ কীভাবে অনুমোদন পেল দারাজ কর্তৃপক্ষেরই এর জবাব দেওয়া উচিত। বিক্রেতাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় দারাজের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।  বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাদের প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানাই। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশি ক্রেতাদের কেউ কেউ দারাজে ভুল পণ্য, মূল্য নির্ধারণ, রিটার্ন ও রিফান্ড নিয়ে অভিযোগ করেছেন। ফেসবুকে হাফেজ সাইফুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা দারাজের একটি অর্ডারের স্ক্রিনশট দিয়ে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়ার অভিযোগ করেন। স্ক্রিনশটে দেখা যায়, পণ্যের মূল্য ১১৬ টাকা হলেও এর সঙ্গে ১৭০ টাকা শিপিং ফি এবং ২৫ টাকা অন্যান্য ফি যোগ হয়েছে। ফলে পণ্যের মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত ১৯৫ টাকা যোগ হয়ে ভ্যাটসহ মোট পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১১ টাকা। অর্থাৎ ১১৬ টাকার পণ্যের জন্য ক্রেতাকে মোট ৩১১ টাকা দিতে হচ্ছে। পোস্টদাতা এ ধরনের চার্জকে অস্বাভাবিক বলে প্রশ্ন তুলেছেন। অনলাইন কেনাকাটায় আরেকটি অভিযোগ হলো কৃত্রিমভাবে বেশি দাম দেখিয়ে তার ওপর বড় ছাড় দেওয়ার প্রচারণা। যেমন কোনো পণ্যের দাম আগে ৫০০ টাকা দেখিয়ে পরে ৫০ শতাংশ ছাড়ে ২৫০ টাকা বলা হলো। ক্রেতার কাছে এটি আকর্ষণীয় মনে হলেও পণ্যটির প্রকৃত বাজারমূল্য কত, সেটি না জানলে ছাড়ের হিসাব অর্থবহ হয় না।

 সুমাইয়া লিসা নামে এক ক্রেতা বলেন, অনলাইনে ৬০-৭০ শতাংশ ছাড় দেখলে মনে হয় খুব সস্তায় কিনছি। পরে একই পণ্য অন্য জায়গায় খুঁজে দেখি প্রায় একই দামে পাওয়া যাচ্ছে। তখন বুঝি, শুধু ডিসকাউন্টের শতাংশ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্রেতার উচিত বিক্রেতার পরিচয়ের পরিবর্তে পণ্যের তথ্য, মূল্য, মান, রিভিউ, রিটার্ন নীতি এবং বিক্রেতার আগের লেনদেনের রেকর্ড যাচাই করা। একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোরও অভিযোগ ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জেনারেল ম্যানেজার এস. একরামুল হক দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আমরা ইদানীং বেশ কিছু অভিযোগ পাচ্ছি। মেইলের মাধ্যমে ভোক্তারা আমাদের অভিযোগ করেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তারা আমাদের মেম্বার হলে আমরা সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিই এবং সমাধানের চেষ্টা করি।

ভোক্তা আইনে ডিজিটাল কমার্স যুক্ত করার প্রস্তাব : অনলাইনে বেচাকেনায় প্রতারণা বাড়লেও বিদ্যমান 'ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯'-এ ডিজিটাল কমার্সের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত নেই। এ কারণে আইনটি সংশোধন করে ডিজিটাল কমার্সকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানান জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিসিবি ভবনে আয়োজিত কর্মশালায় এ তথ্য জানান তিনি।

গণমাধ্যমকর্মীদের অংশগ্রহণে 'ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯' বিষয়ক কর্মশালায় জহিরুল ইসলাম বলেন, অনলাইনে কোনো অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ব্যবস্থা নেয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণের অভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।

ডিজিটাল বেচাকেনায় প্রতারণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনলাইনে প্রতারণা বেড়েছে। ২০০৯ সালের বিদ্যমান আইনে ডিজিটাল কমার্স নেই। তাই ডিজিটাল কমার্সকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধনের প্রস্তাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এটি আইনে অন্তর্ভুক্ত হলে ডিজিটাল বিষয়গুলোতে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হবে।
জহিরুল ইসলাম আরও বলেন, অনলাইনে অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সম্প্রতি চাঁদপুরে অনলাইনে 'চাঁদপুরের ইলিশ' নামে ইলিশ বিক্রির বিষয়টি নজরে আসে। পরে দেখা যায়, এসব ইলিশ অন্যান্য জেলা থেকেও আসছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে একটি তালিকা করা হয়েছে।

অধিদপ্তরের ফেসবুক পেজে কারা সেখানে ব্যবসা করেন, সে বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাজার তদারকিতে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন ভোক্তা-অধিকারের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, বিএসটিআই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের কাজ বেশি সম্পর্কিত। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই জনবল কম এবং সবার কর্মপরিধিও আলাদা।

একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিকবার জরিমানার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ অপরাধ করার পর দ্বিতীয়বার একই অপরাধ প্রমাণ হলে এবং অপরাধের মাত্রা বেশি হলে জরিমানা আরোপ করা হয়। জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দোকানের ধরনসহ পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনা করা হয়। কেউ দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রয়েছে। এ সময় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার মতো অভিযোগেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান মহাপরিচালক। 

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধে অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তাহমিনা বেগম জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ হাজার ১৪৮টি বাজার অভিযান পরিচালনা করে ২৪ হাজার ২২৩টি প্রতিষ্ঠানকে দন্ড দেওয়া হয়। এসব অভিযানে ১৯ কোটি ৮০ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ হাজার ৮৮২টি অভিযানে ২৬ হাজার ২৯৭টি প্রতিষ্ঠানকে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি করা হয়। এ সময় জরিমানা আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৮ কোটি ৮১ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ হাজার ২৭৯টি বাজার অভিযানে ২৭ হাজার ২৪৩টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ সময় ২৪ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ২০২৬-২৭অর্থবছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ৯২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩ হাজার ৬২৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কর্মশালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক সেবাষ্টিন রেমা ও আতিয়া সুলতানা, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অনলাইন প্রতারণা বাড়ছে, পণ্য পেয়ে হতাশ হচ্ছেন ক্রেতারা

চুলায় রান্না করা খাবারে পড়ে নারীর মৃত্যু

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই : প্রধানমন্ত্রী

গাজায় ইসরায়েলি হামলার নিন্দা, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন ফ্রান্স-যুক্তরাজ্য-কানাডার

আগামী বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন : প্রতিমন্ত্রী

আর্সেনালের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে আর্তেতা