বগুড়ায় আগুনের ঝুঁকিতে মার্কেট ও শপিংমল, নিউ মার্কেটে আন্ডারগ্রাউন্ড জলাধার নির্মাণ জরুরি
স্টাফ রিপোর্টার : আগুনের ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে বগুড়া মহানগরের অধিকাংশ মার্কেট ও শপিংমল। এর মধ্যে বগুড়া নিউ মার্কেটের অবস্থা ভয়াবহ। মার্কেটটিতে আগুন লাগলে নিজস্ব জলাধার থেকে পানি ব্যবহার করার সুযোগ নেই। কারণ মার্কেটের নিজস্ব আন্ডারগ্রাউন্ড জলাধার নেই।
এই জলাধার না থাকায় আগুন নেভাতে দেরি হয়। ততক্ষণে আগুনে পুড়ে সব শেষ হয়ে যায়। তাই নিউ মার্কেটের পাশে মহানগরের চাঁদনীবাজার (কাঁঠালতলা) গালাপট্টি ও ফতেহ আলী মোড়ে রাস্তার নিচে আন্ডার গ্রাউন্ড জলাধার নির্মাণ জরুরি। জলাধার নির্মাণে ব্যবসায়ীরা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের সহযোগিতা চান।
এবিষয়ে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন এর প্রশাসক এম.আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, ব্যবসায়ীদের আন্ডার গ্রাউন্ড জলাধারের দাবি অমুলক নয়। কিন্তু এটি নির্মাণে কেউ জায়গা দিতে চায়না। তারপরও নিউমার্কেটের পাশে কোন জায়গায় আন্ডার গ্রাউন্ড জলাধার নির্মাণ করা যায় কিনা সেবিষয়ে তিনি ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স বগুড়ার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে উদ্যোগ নিবেন।
বগুড়া ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর একাধিক কর্মকর্তা বলেন,নিউ মার্কেটে পানির প্রাকৃতিক উৎস একেবারে কম। মার্কেটের অদূরে করতোয়া নদীতে পানির প্রাকৃতিক উৎস থাকলেও বর্ষা মৌসুম ছাড়া এই নদীতে তেমন পানি থাকেনা। শীতকালে নদীর পানি শুকিয়ে গিয়ে ময়লা ও কাদাযুক্ত হয়। যা আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া ওই মার্কেট থেকে দূরে ঝাউতলা এলাকায় একটি পুকুর আছে। আগুন লাগলে সেখান থেকে পানি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পুকুরটি দূরে পাইপ লাগিয়ে পানি আনতে সময় লাগে। সেইসাথে নিউ মার্কেটের রাস্তা ও সিঁড়ি খুবই সরু ও বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থাও নেই। এ ছাড়াও দোকান গুলোর সামনের যাতায়াতের প্যাসেজ অত্যন্ত কম। আগুন লাগলে মার্কেট থেকে নেই বেরিয়ে আসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও।
এদিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বৈদুতিক পোলগুলো থেকে নিউ মার্কেটের দোকানগুলোতে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেয়া হয়েছে। এমনভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেয়া হয়েছে দেখে মনে হয় ‘পাখির বাসা’। পোলগুলোতে তারগুলো ঝুঁলে থাকে। এমনকি একটি পোল থেকেই শতাধিক সংযোগ নেয়া হয়েছে।
যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যা থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। এছাড়া নিউ মার্কেটে আগুন নেভানোর আধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোজনও নগণ্য। মার্কেটগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) নেই। বিষয়টি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন।
ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স অফিস বগুড়ার সহকারি পরিচালক মো. রফিকুজ্জামান বলেন, শুধু নিউ মার্কেটই নয়, মহানগরের চুড়িপট্টি, হকার্স মার্কেট, শাপলা মার্কেট ও শপিংমলসহ বগুড়ার অধিকাংশ মার্কেট আগুনের ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অগ্নিঝুঁকিতে আছে বৃহত্তর নিউ মার্কেট। সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, এই মার্কেটে আগুন থেকে বাঁচতে প্রতিটি দোকানে এই অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র যেন রাখা হয় সেজন্য কমিটির ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে তাগিদ দেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহি গাড়ি থেকে পানি ব্যবহার করতে হয়। তাদের মাত্র দুটি পানিবাহি গাড়িতে রিজার্ভ থাকে ১০ হাজার লিটার পানি। যা বড় আগুন নেভাতে পর্যাপ্ত নয়। এ জন্য আশেপাশে নদী ও পুকুর ও ডোবা থেকে পাইপ দিয়ে পানি এনে আগুন নেভাতে হয়। কিন্তু দু:খজনক ব্যাপার হলো মহানগরের অধিকাংশ পুকুর ও ডোবা ভরাট করা হয়েছে।
আরও পড়ুনবাড়ি বা ভবন নির্মাণে প্রয়োজনে পুকুর ও ডোবা ভরাট করা হচ্ছে। এতে পানির উৎস কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া করতোয়া নদীতেও সব সময় পর্যপ্ত পানি থাকে না। এ জন্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি পাওয়া কঠিন। তাই নিউ মার্কেটসহ অন্যান্য মার্কেট, শপিংমল, সুউচ্চ ভবন এর আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার (জলাধার) নির্মাণ করা প্রয়োজন।
সহকারী পরিচালক বলেন, অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি থেকে বিপদমুক্ত থাকতে হলে মার্কেটগুলো থেকে বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা,বিকল্প সিঁড়ি, মার্কেটের ভুগভ্যস্থ জলাধার,অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র,ডিটেকশন সিস্টেম থাকাসহ তিন মাস পর পর বৈদুতিক তার পরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেইসাথে আগুন নেভানোর জন্য ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ থাকাও দরকার। এই প্রশিক্ষণ থাকলে অগ্নিকান্ডে ঘটনা কমে আসবে।
কর্মকর্তারা বলেন, বগুড়া নিউ মার্কেটের বৈদুতিক পোলগুলো থেকে এমনভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেয়া হয়েছে দেখে মনে হয় ‘পাখির বাসা’। পোলগুলোতে তারগুলো ঝুঁলে থাকে। এমনকি একটি পোল থেকেই ২শ’র অধিক সংযোগ নেয়া হয়েছে। যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার ঝুঁকি বেড়েছে।
বগুড়া বৃহত্তর নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী মালিক সমিতি’র সাধারন সম্পাদক মো: রাশেদুল ইসলাম নিউ মার্কেটের অধিকাংশ দোকানে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা ও আন্ডার গ্রাউন্ড জলাধার না থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, তাদের মার্কেটের প্রায় তিন হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অফিস থেকে দোকানে দোকানে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র রাখা এবং জলাধার নির্মাণের বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, মার্কেটের বড় কিছু দোকানে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ দোকানে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা নেই। মার্কেটে সব দোকানে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র রাখার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতা বলেন আন্ডার গ্রাউন্ড জলাধার নির্মাণ জরুরি। মার্কেটের পাশে কাঁঠালতলা ও গালাপট্টিতে আন্ডার গ্রাউন্ড জলাধার নির্মাণে সরকার ও বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতা কামনা করেন এই নেতা।
উল্লেখ্য, শহরের নিউ মার্কেট, হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে ও বিভিন্ন শপিংমলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে। এসব মার্কেটে যে কোনো সময় শর্টসার্কিট বা অসাবধানতা থেকে ঘটতে পারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। কয়েক বছর আগেও বগুড়া নিউ মার্কেটে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে ৩-৪ বার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।
এতে কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও নিউ মার্কেটসহ মহানগরের অধিকাংশ মার্কেটেই নেই অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা। যদিও কিছু ব্যবস্থা থাকলেও তার বেশিরভাগই আবার মেয়াদ উত্তীর্ণ। এছাড়া এলোমেলোভাবে বৈদ্যুতিক তার টানা ও পানির যথেষ্ট ব্যবস্থা না থাকাও আগুনের ঝুঁকি বাড়ার অন্যতম কারণ।
বগুড়া ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের একাধিক কর্মকর্তর বলেন, অগ্নিঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন, বিদুৎ বিভাগ ও নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী মালিক নেতৃবৃন্দকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মন্তব্য করুন







