এম আব্দুল হালীম বাচ্চু
শরতের কাশফুল মেলা
শরৎ এসেছে। বর্ষার কালো মেঘগুলো বিদায় নিয়েছে, আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নীলের মখমল। সাদা সাদা মেঘ যেন নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো তুলোর নৌকা। ভোরের কোমল রোদে শিশিরবিন্দুগুলো ঘাসের ডগায় মুক্তোর মতো ঝিলমিল করে। আর নদীর তীরে ফুটে থাকা কাশফুল দেখে মনে হয়, প্রকৃতি বুঝি সাদা শাড়ি পরে উৎসবের সাজে সেজেছে। ইছামতি নদীর তীরজুড়ে তখন কাশফুলের মেলা। নদীর স্বচ্ছ জলে আকাশের নীল ছায়া, আর তীরে সারি সারি কাশবন। হালকা বাতাস এলেই কাশফুলগুলো দুলে ওঠে। মনে হয়, সাদা পালকের অসংখ্য পাখি একসঙ্গে ডানা মেলেছে। দশ বছরের রোদেলা আর তার ছোটো ভাই হিমু এক সকালে নদীর তীরে বেড়াতে এলো। রোদেলার হাতে একটি ছোট খাতা ও পেন্সিল।
প্রকৃতির ছবি আঁকা তার খুব শখ। হিমুর হাতে একটি দূরবীন। পাখি দেখা তার নেশা। কাশবনের কাছে পৌঁছেই হিমু আনন্দে চিৎকার করে উঠল,—আপু, দেখো! এত কাশফুল! মনে হচ্ছে নদীর তীরে সাদা মেঘ নেমে এসেছে! রোদেলা হাসল। বলল,—শুধু মেঘ নয়, হিমু। আমার মনে হয়, শরতের হাসিও এখানে ফুল হয়ে ফুটেছে। হিমু কাশফুলের কাছে গিয়ে একটি ফুল ছিঁড়তে হাত বাড়াল। রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে বলল,—থামো! ফুলটা ছিঁড়ো না। হিমু অবাক হয়ে বলল,—একটা ফুল ছিঁড়লে কী হবে আপু? রোদেলা বলল,—একটা ফুল তোমার কাছে ছোটো ব্যাপার। কিন্তু এই কাশবনে যদি সবাই একটি করে ফুল ছিঁড়ে নেয়, তাহলে একসময় এখানে আর কোনো কাশফুল থাকবে না। প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু নিজের জন্য উপভোগ করতে নেই, অন্যদের জন্যও রেখে যেতে হয়। হিমু হাত সরিয়ে নিলো। —ঠিক বলেছ আপু। আমি ফুল ছিঁড়ব না, বরং ছবি তুলব। দুজন নদীর পাড়ে বসে পড়ল। হিমু দূরবীন চোখে লাগিয়ে পাখি খুঁজতে লাগল। রোদেলা খাতায় কাশফুল আঁকতে শুরু করল। এমন সময় হিমু দূরে একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। —আপু, ওদিকে কী যেন পড়ে আছে! দুজন দ্রুত এগিয়ে গেল। কাশবনের পাশে একটি ছোট পাখি মাটিতে পড়ে আছে। তার ডানায় সামান্য আঘাত লেগেছে। পাখিটি ভয়ে কাঁপছিল। রোদেলা খুব সাবধানে পাখিটিকে হাতে তুলে নিলো।
—ভয় পেয়ো না ছোট্ট বন্ধু। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।
হিমু বলল,—একে কোথায় নিয়ে যাব? রোদেলা একটু ভেবে বলল,—চলো, নদীর ওপারের বাড়ির দাদুর কাছে যাই। তিনি পাখি আর গাছপালা সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। তারা পাখিটিকে নিয়ে গেল বৃদ্ধ করিম দাদুর কাছে। দাদু পাখিটির ডানা দেখে প্রয়োজনীয় যত্ন নিলেন। তারপর একটি ছোটো ঝুড়িতে নরম কাপড় বিছিয়ে পাখিটিকে রাখলেন। দাদু বললেন,—প্রকৃতি আমাদের শুধু সৌন্দর্য দেয় না, দায়িত্বও শেখায়। ফুলকে ভালোবাসতে হলে ফুলকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। পাখিকে ভালোবাসতে হলে তার আকাশটাও নিরাপদ রাখতে হয়। হিমু মন দিয়ে কথাগুলো শুনল।
কয়েক দিন পর পাখিটি সুস্থ হয়ে গেল। এক সকালে তারা আবার ইছামতির নদীর তীরে এলো। করিম দাদুও সঙ্গে ছিলেন। কাশফুলের নরম সাদা ঢেউয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দাদু ঝুড়িটি খুলে দিলেন। পাখিটি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তারপর ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল। হিমু আনন্দে হাততালি দিয়ে বলল,—আপু, দেখো! ও আবার আকাশে ফিরে গেল! রোদেলার চোখে আনন্দের ঝিলিক।
—”হ্যাঁ, হিমু। কাউকে তার নিজের পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিতে পারার আনন্দের মতো আনন্দ আর কী আছে?” পাখিটি নীল আকাশে ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো মিলিয়ে
গেল। নিচে ইছামতির জল তখন রোদের আলোয় চিকচিক করছে। কাশফুলগুলো বাতাসে দুলছে—যেন সাদা সাদা হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। রোদেলা তার খাতার শেষ পাতায় কাশফুলের ছবি এঁকে নিচে লিখল—
“কাশফুল শরতের হাসি,
নদী তার গানের সুর
প্রকৃতিকে বাসলে ভালো
অশান্তি হয় দূর।”
হিমু লেখাটি পড়ে মৃদু হেসে বলল,—আপু, আগামী বছরও আমরা এখানে আসব তো?
রোদেলা বলল,—অবশ্যই। তবে শুধু দেখতে নয়—এই কাশবন, নদী আর পাখিদের ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়েই আসব।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক





_medium_1787997453.jpg)


_original_1788073649_medium_1789280380.jpg)