ভিডিও বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:০২ এএম

আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় তৈরি হওয়া সংকট এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপে রূপ নিয়েছে। নামে-বেনামে নেওয়া বিপুল ঋণের একটি বড় অংশ ফেরত না আসায় লাগামহীনভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। এতে এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনও বেড়েছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না অনেক ব্যাংক।

ফলে চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এত বড় প্রভিশন ঘাটতি আর্থিক দুর্বলতারই বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়ে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পাঁচটি ব্যাংকে মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতিতে রয়েছে জনতা ব্যাংকে, যার পরিমাণ ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। এরপরই বিপুল অঙ্কের সঞ্চিতি ঘাটতি নিয়ে ধুঁকছে অগ্রণী ব্যাংক, ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এরপর রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।

এরপরই বিপুল অঙ্কের সঞ্চিতি ঘাটতি নিয়ে ধুঁকছে অগ্রণী ব্যাংক, ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এরপর রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।  রাষ্ট্রায়ত্ত এসব ব্যাংকে পর্যাপ্ত ব্যাকআপ তহবিল না থাকায় আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তিকে ভেতর থেকে ভঙ্গুর করে ফেলছে।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংকে নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) ঘাটতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যার সম্মিলিত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

এর মধ্যে একক ব্যাংক হিসেবে সর্বোচ্চ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার বিশাল সঞ্চিতি ঘাটতি নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।

এছাড়া অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি টাকা, মার্কেটাইল ব্যাংক ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা, এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের পবিসং ঘাটতি ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা; যা পুরো বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।

ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থার পেছনে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, মূল সমস্যাই হলো খেলাপি ঋণ; খেলাপি না থাকলে প্রভিশন ঘাটতিও থাকে না। কিন্তু খেলাপিদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়া এবং ঘাটতি থাকার পরও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ রাখার মতো সিদ্ধান্ত থেকে ব্যাংকিং খাতে ভুল বার্তা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের আত্মঘাতী নীতির শেষ পরিণতি হলো আমানতকারীদের অর্থকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া। তাই সংকট নিরসনে ক্ষতিকর নীতিমালা অবিলম্বে বাতিল করে ঋণ আদায় ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি ঋণ। তার মানে ১০০ টাকার ঋণে খেলাপি ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সা। এর সিংহভাগই আদায় অযোগ্য।

ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের কারণ তুলে ধরে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ’-এর নির্বাহী পরিচালক ও মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মূলত লুটপাটের উদ্দেশ্যেই ঋণ নেন এবং বছরের পর বছর তা ফেরত দেন না। 

বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকও এসব খেলাপিদের বারবার নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে, যা দেশে ঋণ শোধ না করার এক অপসংস্কৃতি তৈরি করেছে।

তিনি মনে করেন, অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংকগুলো আজ এই নাজুক অবস্থায় পড়েছে। তাই ব্যাংক খাতকে রক্ষা ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বড় খেলাপিদের তোষণ বন্ধ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান এই বিশ্লেষক।

আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঋণের মান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। সাধারণ ঋণে দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপি ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসানি ঋণে শতভাগ প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক।

প্রভিশন ঘাটতি হলে ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারে না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে না পারলে মূলধন ঘাটতিতে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি কমাতে হলে খেলাপি ঋণ কমানো ও ঋণ আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

আড্ডা দেওয়ার সময় নদীর পাড় ধস, বিজিবি সদস্যসহ নিখোঁজ ২

পরমাণু ইস্যুতে ইরানকে পশ্চিমাদের চাপ, কড়া সমালোচনায় চীন-রাশিয়া

লেজেন্ডস লিগে বাংলাদেশের অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ

৫ বছরের মধ্যে সেচপাম্পে ডিজেলের বদলে সৌরবিদ্যুৎ: প্রধানমন্ত্রী

কক্সবাজারে অস্ত্র-গোলাবারুদসহ ৩ ডাকাত আটক