মেমোহীন লেনদেনে ওষুধ কিনে ঠকছেন ক্রেতারা
স্টাফ রিপোর্টার : দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচের বড় একটি অংশই ব্যয় হয় ওষুধ কিনতে। অথচ জীবনরক্ষাকারী জরুরি উপাদানটি কিনতে গিয়ে খুচরা বাজারে প্রতিনিয়ত অস্পষ্টতা, অতিরিক্ত দাম এবং আইনি অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন ক্রেতারা।
মোড়কে সঠিক দাম না থাকা, বিক্রি রসিদ (ক্যাশ মেমো) না দেওয়া এবং তদারকির অভাবে মাঠপর্যায়ে ওষুধ কেনাবেচায় এক ধরনের মারাত্মক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অথচ আইন অনুযায়ী প্রতিটি ওষুধের ব্লিস্টার বা ফয়েল পেপারের পাতায় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) থাকা বাধ্যতামূলক। তবে বাস্তবে বেশিরভাগ কোম্পানি কেবল বাইরের মূল বক্সে দাম প্রিন্ট করে। ফলে খুচরা দোকানে পাতা কেটে ওষুধ বিক্রি করলে দামের কোনো তথ্যই ক্রেতার কাছে থাকে না।
বগুড়া শহরের খান মার্কেটে ওষুধ কিনতে আসা গৃহিনী রুমি বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি প্রেশারের রোগী। প্রতি মাসে দুই-তিন হাজার টাকার ওষুধ লাগে। দোকানে গেলে পাতা কেটে ছোট টুকরো দেয়, তাতে কোনো দাম লেখা থাকে না, পাতা ওষুধেও তাই। দোকানদার যত টাকা চায়, সেই টাকা দিয়ে আসি। বেশি রাখছে কি না, তা জানারও কোনো উপায় নেই, মেমো কোন দিন চাইনি।
দিনমজুর শফিকুল ইসলাম বলেন, ছেলের জ্বরের জন্য ওষুধ কিনে ৩২০ টাকা দিলাম। কোন ওষুধের কত দাম ধরলো তাও বুঝতে পারলাম না, ক্যাশ মেমো চাইলে দোকানদার রেগে গিয়ে বলেন, ‘ছোট দোকানে কিসের মেমো? নিলে নেন, না হলে যান।’
শহরের ঝাউতলায় ওষুধ কিনতে আসা অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী হোসেন কবিরাজ বলেন, দোকানদার ওষুধ নিয়ে যে দাম চাইতো, চোখ বন্ধ করে তা দিয়ে আসতাম। পরে এখানে এসে হিসাব করে দেখলাম, প্রতি পাতায় ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি ধরছে।
আইন অনুযায়ী বিক্রির সময় লিখিত মেমো দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও শহরের বেশিরভাগ ফার্মেসিতে তা মানা হয় না। রসিদ না থাকায় ওষুধ ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ বা অতিরিক্ত দাম নেয়া হলেও প্রমাণ করার সুযোগ থাকে না।
আরও পড়ুনবেশিরভাগ ফার্মেসি মালিকের দাবি, শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো মাত্র ১২ থেকে ১৬ শতাংশ কমিশন দেয়, যা দিয়ে দোকান ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল মেটানো কঠিন। তাদের দাবি ১২ শতাংশ লাভে ব্যবসা চালানো অসম্ভব। তাই যেগুলোতে ২০-৩০ শতাংশ কমিশন থাকে, সেগুলো কাস্টমারকে বেশি দেন তারা। আর প্রেসক্রিপসন অনুযায়ী ওষুধ বিক্রিতে তারা ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্রেতাদের কমিশন দিয়ে থাকেন।
তবে চেইন ফার্মেসি বা শহরের অনেক ফার্মেসিতেই এখন সরকার নির্ধারিত ডিজিটালি আপডেট হওয়া এমআরপি মেনেই মেমোসহ ওষুধ বিক্রি হয়, তবে সেই সংখ্যা হাতেগোনা। আর গ্রাম-গঞ্জে, হাটে-বন্দরে গড়ে ওঠা ওষুধ বিক্রির দোকানগুলোতেই সাধারণ মানুষ বেশি ঠকছেন।
তবে এই নির্মম বাস্তবতার পেছনে প্যাকেজিং ও ব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন বিক্রেতারা। কোম্পানিগুলো স্ট্রিপে না দিয়ে বক্সে দাম প্রিন্ট করে। ১০টার পাতা কেটে ৫টা দিলে তো দামের অংশ কাটা পড়ে যায়। আর দুই টাকার গ্যাস্ট্রিক রোগের ট্যাবলেটের জন্য কোন ক্রেতাই মেমোর জন্য অপেক্ষা করেন না বলে দাবি তাদের।
খুচরা বাজারের এই সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, প্যাকেটের গায়ে দাম না থাকা কিংবা কেনাকাটায় ক্যাশ মেমো না দেওয়া স্পষ্টতই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
তবে ওষুধের গায়ে দাম লেখা না থাকার বিষয়টি দেখভাল করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। তিনি আরও বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ যদি মেমো ছাড়া ওষুধ কেনা বন্ধ করেন এবং যেকোনো অতিরিক্ত দামের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ আমাদের কাছে লিখিত বা অ্যাপে অভিযোগ জানান, তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট নিরসনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (ডিজিডিএ) প্রতিটি সিঙ্গেল ট্যাবলেট বা স্ট্রিপের অংশের ওপর স্পষ্টভাবে দাম লেখা বাধ্যতামূলক করা উচিত। একই সাথে ডিজিটাল বা ম্যানুয়াল ক্যাশ মেমো দেওয়া নিশ্চিত করা এবং মোবাইল অ্যাপ ‘বিডি ড্রাগ ইনডেক্স’ এর প্রচার বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।
মন্তব্য করুন






