প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:১৯ পিএম
শুভ জন্মদিন সাবিনা ইয়াসমিন
সাবিনা ইয়াসমিন
বিনোদন ডেস্ক : বাংলা সংগীতের নক্ষত্র ও জীবন্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের ৭২তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৫৪ সালের এই দিনে সাতক্ষীরায় জন্মগ্রহণ করেন গুণী এই শিল্পী। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সংগীতচর্চা করে তিনি বাংলা গানের জগতে নিজের জন্য তৈরি করেছেন এক অনন্য অবস্থান।
সংগীতপরিবারে জন্ম নেওয়া সাবিনা ইয়াসমিন ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। তার বাবা লুতফর রহমান ব্রিটিশ রাজের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা বেগম মৌলুদা খাতুন ছিলেন কণ্ঠশিল্পী এবং সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ কাদের বকশের কাছে গানের তালিম নিয়েছিলেন। পাঁচ বোনের মধ্যে চারজনই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারা হলেন ফরিদা ইয়াসমিন, ফৌজিয়া ইয়াসমিন, নীলুফার ইয়াসমিন ও নাজমা ইয়াসমিন।
মাত্র সাত বছর বয়সেই মঞ্চে উঠে গান করেন সাবিনা ইয়াসমিন। বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিন যখন ওস্তাদ দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে গানের তালিম নিতেন, তখন পাশে বসে সেই গান শুনে শুনেই সেগুলো কণ্ঠে তুলে নিতেন ছোট সাবিনা।
প্রতিবেশী সংগীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদ তার গায়কী প্রতিভা প্রথম আবিষ্কার করেন। বাড়িতে হারমোনিয়ামে বসে তিনি যে গানটি প্রথম শেখেন, সেটি ছিল ‘খোকন মণি সোনা’। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওস্তাদ পি সি গোমেজের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন তিনি।
এরও আগে ১৯৬২ সালে পরিচালক এহতেশামের উদ্যোগে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে রবীন ঘোষের সুরে একটি গানে অংশ নেন সাবিনা ইয়াসমিন। শৈশবে বেতারের ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে ছোটদের গান গেয়েও তিনি প্রশংসা অর্জন করেন।
১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭২ সালে ‘অবুঝ মন’ চলচ্চিত্রে ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ গানটি গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে সাবিনা ইয়াসমিন শুধু চলচ্চিত্রের গান কিংবা দেশাত্মবোধক গানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। উচ্চাঙ্গ, ধ্রুপদী, লোকসংগীত ও আধুনিক বাংলা গানসহ বিভিন্ন ঘরানায় কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। তার কণ্ঠের বৈচিত্র্য ও গায়কী তাকে বাংলা সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীর মর্যাদা এনে দিয়েছে।
প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সুরকার আর. ডি. বর্মণের সুরেও গান করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন। ‘শত্রু’ চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি ইন্দো-বাংলা যৌথ প্রযোজনার ‘অন্যায় অবিচার’ চলচ্চিত্রে ‘ছেড়ো না ছেড়ো না হাত’ গানটিতেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
বাংলা উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পীদের সঙ্গেও দ্বৈত গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। কিশোর কুমার, মান্না দে ও শ্যামল মিত্রের সঙ্গে দ্বৈত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। শ্যামল মিত্রের সঙ্গে তার গাওয়া ‘পথের সাথী নামো গো পথে আজ’ গানটিও শ্রোতাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। এ ছাড়া ভূপেন হাজারিকার সুরে ও মাসুদ করিমের গীতিতে দুটি গান করেছেন তিনি।
দেশাত্মবোধক গানেও সাবিনা ইয়াসমিনের অবদান অসামান্য। তার কণ্ঠে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘ও আমার বাংলা মা’, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘মাঝি নাও ছাড়িয়া দে’, ‘ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য’ এবং ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতা’র মতো গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে আছে।
বিশিষ্ট সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সুরে তার গাওয়া ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে’ ও ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’ গান দুটি এখনও সমান জনপ্রিয়। ‘একবার যেতে দে না’, ‘কতো সাধনায় এমন ভাগ্য মেলে’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘মনেরই রঙে রাঙাবো’ ও ‘তুমি বড় ভাগ্যবতী’র মতো অসংখ্য গান তার সমৃদ্ধ সংগীতভান্ডারের অংশ।
ক্যারিয়ারে সাবিনা ইয়াসমিন প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গান গেয়ে তিনি কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি প্রায় ১৪ বার বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্পকলার সংগীত শাখায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।
এদিকে সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে চ্যানেল আই। চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুর রহমানের সঞ্চালনায় ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ শিরোনামের অনুষ্ঠানটি রাত ১০টা ২০ মিনিটে প্রচারিত হবে। অনুষ্ঠানটি শুক্র ও শনিবার প্রচার করা হবে।
বাংলা সংগীতের দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দেওয়া সাবিনা ইয়াসমিন আজও শ্রোতাদের কাছে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অনন্য নাম। জন্মদিনে এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।
মন্তব্য করুন





_medium_1788426705.jpg)
_medium_1788410856.jpg)