গত মার্চ মাসে সন্ত্রাসীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন পাশের পর এবার নতুন ফাঁসির মঞ্চ বানাচ্ছে ইসরায়েল। নতুন ফাঁসির মঞ্চে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা যাতে ফাঁসি কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি দেখতে পান সে জন্য বিশেষ বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন আইনটি এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে শুধু ফিলিস্তিনিদেরই এই আইনে সন্ত্রাসী অভিহিত করে ফাঁসি দেয়া যায়।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের প্রভাবশালী অংশীদার ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির একটি ভিডিওতে নতুন ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণের বিষয়ে অহংকার করে বক্তব্য রাখেন।
বেন-গ্যভিরের কট্টরপন্থি ওতজমা ইয়েহুদিত পার্টির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা ভিডিওতে অতি-ডানপন্থি ইসরায়েলি মন্ত্রী বলেন, এই ফাঁসি কার্যকর করার স্থানে ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ফাঁসি দেখার বিশেষ বুথ বা গ্যালারি থাকবে। তিনি বলেন, এই স্থানে শুধুমাত্র সন্ত্রাসী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ফিলিস্তিনিদেরই ফাঁসি দেওয়া হবে। একটি অজ্ঞাত স্থানে বেন-গ্যভিরের পরিদর্শনের সময় ধারণ করা ওই ভিডিও ক্লিপটিতে ইসরায়েলি মন্ত্রীকে নির্মাণাধীন স্থানটির দিকে আঙুল উঁচিয়ে অহংকার করতে দেখা যায় এবং তিনি বলেন, এটি এমন একটি জায়গা যেখানে সন্ত্রাসীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।
ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমি কারাগারে সন্ত্রাসীদের অবস্থা আরও শোচনীয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আমরা তা রেখেছি।
আমি সন্ত্রাসীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড আইন পাস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম; আমরা তা করেছি। আর এখন মৃত্যুদণ্ড এবং ফাঁসি কার্যকরের কেন্দ্রটিও রূপ নিতে শুরু করেছে। ‘
ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই স্থানের অন্যান্য ছবিতে দেখা গেছে, একটি ঘেরাও করা এলাকায় নির্মাণকাজ চলছে, যা একটি কারাগারের কাছাকাছি অবস্থিত বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে 'সন্ত্রাসীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড আইন' পাস হওয়ার পর এই ভিডিও ফুটেজটি প্রকাশ পেল।
আরও পড়ুন
এর মাধ্যমে ইসরায়েল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সম্প্রসারণকারী হাতেগোনা কয়েকটি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে একটিতে পরিণত হলো। অত্যন্ত বিতর্কিত এই আইনে সামরিক আদালতগুলোকে সন্ত্রাস-সম্পর্কিত মামলাগুলোতে একমাত্র শাস্তি হিসেবে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আইনটি কেবল মারাত্মক হামলায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
ইসরায়েলের নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনের অন্যতম প্রধান হোতা বেন-গ্যভির গত মে মাসে একটি ফাঁসির দড়ির ছবি দিয়ে সাজানো বার্থডে কেক কেটে তার ৫০তম জন্মদিন উদযাপন করেছিলেন। বেন-গ্যভির অতি-ডানপন্থি এবং চরম ইহুদি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের অনুসারী।
তিনি আরব-বিরোধী এবং ফিলিস্তিনি-বিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। একসময় ইসরায়েলি সমাজে তার চিন্তাভাবনাকে অত্যন্ত উগ্র ও প্রান্তিক মনে করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর, ইসরায়েলি জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।
বারবার চরমপন্থি বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের জন্য বিতর্কিত বেন-গ্যভির ২০২২ সাল থেকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত মে মাসে বেন-গ্যভিরের পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায় গাজার আটককৃত ত্রাণকর্মীদের হাত বাঁধা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েল কর্তৃক একটি ত্রাণবাহী বহরকে বাধা দেওয়ার পর এই ঘটনা ঘটেছিল। গত ১৬ আগস্ট এক পডকাস্টে বেন গ্যভির প্রতি রাতে গাজায় ৩০/৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যার প্রস্তাব করেছিলেন। একই পডকাস্টে তিনি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের গণ অভিবাসনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের কম খাবার দেয়াসহ নানা নির্যাতন করা হয়। গত বছর ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য বেন-গ্যভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।