গণহত্যাকারী কোনো শক্তিকে আর রাজনীতি করার সুযোগ দেবে না জনগণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে আওয়ামী লীগের দায় তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষ হলে রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। বাংলাদেশের মানুষ গণহত্যাকারী কোনো শক্তিকে আর রাজনীতি করার সুযোগ দেবে না।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একার অর্জন নয়; এটি দেশের কোটি মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ফসল। তাই জুলাইকে দলীয়করণের পরিবর্তে এর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নেই সবাইকে মনোযোগী হতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই ভেন্যুতেই ৫ আগস্টসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীও একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। অনুষ্ঠানে এক শহীদ জননীর আবেগঘন বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় যিনি সাধারণ গৃহিণী ছিলেন, জুলাইয়ের নির্মম বাস্তবতা তাকে বিশ্বমানের বক্তায় পরিণত করেছে। শহীদ পরিবার ও আহতদের আত্মত্যাগই প্রমাণ করে, তিনি বেঁচে আছেন তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার জন্য।
তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে প্রতিবাদ জানানো ব্যক্তিদের বক্তব্যও আমি মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। জুলাই আন্দোলনে সামনে ও পেছনে থেকে যারা সমন্বয় করেছেন, তাদের অবদানও স্মরণ করি। প্রধানমন্ত্রী যদি দীর্ঘদিন নির্বাসনে না থাকতেন, তাহলে হয়তো আরও সুসংগঠিতভাবে আন্দোলন পরিচালনা করা সম্ভব হতো। সে সময় মাঠের অধিকাংশ নেতৃত্ব কারাগারে, গুম বা আত্মগোপনে ছিলেন। তবুও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ স্বৈরাচারের পতন ঘটে।
নিজের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আয়নাঘরে ৬১ দিন থাকার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। সেখানে একজন মানুষ ২৪ ঘণ্টাও থাকতে পারবে না। তিনি মীর কাসেম আলীর পরিবারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, স্বৈরাচার কেবল ব্যক্তিকে নয়, পরিবারকেও ধ্বংস করেছে। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি বলেন, যদি আমরা বলতে শুরু করি— জুলাই কার, তাহলে জুলাই কারও থাকবে না।
তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু জাতি শত বছর সংগ্রাম করেও স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে। এটি নিউটনের আপেলের মতো হঠাৎ পড়ে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়; দীর্ঘ প্রস্তুতি, ত্যাগ ও সংগ্রামের ফসল। তাই এ অর্জনকে কখনো দলীয়করণ করা যাবে না।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানানো হয়েছে। গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের কার্যকর পথ হলো সাংবিধান সংশোধন। প্রতিটি সংশোধনীই একেকটি সংস্কার। সংসদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা হবে।
তিনি জানান, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনে জোরপূর্বক গুমের মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। খসড়া আইন জনমতের জন্য ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
আরও পড়ুন
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান মাত্র ৩৬ দিনের ঘটনা নয়। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, গুম, খুন, হামলা-মামলা এবং নির্যাতনের ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এই গণঅভ্যুত্থান। বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির অসংখ্য নেতা-কর্মী এ সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শহীদ পরিবার, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন এবং নির্যাতিত মানুষের ত্যাগ ছাড়া জুলাইকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ পথ বন্ধ করে দেওয়া হলে রক্তাক্ত সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও তাই হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়নই আন্দোলনকে রক্তাক্ত করেছে। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়েই ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে।
একাত্তরের চেতনাকে রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেই চেতনাকে ব্যবহার করতে করতে আওয়ামী লীগ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। একই ভুল যেন জুলাইয়ের চেতনাকে কেন্দ্র করে না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাই বাংলাদেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের সম্মিলিত অর্জন। সামনের সারিতে যারা শহীদ হয়েছেন, তারাই প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা ও প্রকৃত নেতা। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই সবার দায়িত্ব। জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা নয়, বরং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত।
সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে এমন একটি সংশোধনী আনা হবে, যা দীর্ঘদিন দেশের পথচলার ভিত্তি হবে। কারণ বারবার জুলাই আসে না, বারবার একাত্তরও আসে না। এই ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
তিনি জুলাই বিপ্লবে যারা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন এবং যারা সম্পূর্ণভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য পৃথক শ্রেণিবিন্যাস করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এখনো তালিকাভুক্ত না হওয়া প্রকৃত আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদেরও তালিকাভুক্ত করার দাবি জানান।
বক্তব্যের শেষাংশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বিতর্ক ও সংসদীয় বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো সরকার যাতে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী আচরণ করতে না পারে, সে জন্য জুলাই জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে। জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য— গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন। এটা নিশ্চিত করাই হবে সবার প্রধান দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








