ভিডিও বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৯ জুলাই, ২০২৬ ০৫:৩৭ পিএম

পরিচয় পর্বের নামে জবি বাসে 'র‍্যাগিং', ক্ষোভ ও মানসিক যন্ত্রণায় শিক্ষার্থীরা

জবি প্রতিনিধি : ​জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বিশ্ববিদ্যালয় বাস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই বাসগুলোতে ‘পরিচিতি পর্ব’ ও ‘শৃঙ্খলা’ শেখানোর নামে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের একাংশ সিনিয়রের হাতে মানসিক হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ পরিচয় পর্বের গণ্ডি পেরিয়ে জুনিয়রদের জোরপূর্বক গান, কবিতা বা কৌতুক বলতে বাধ্য করা এবং তা নিয়ে উপহাস করার এক অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, এটি কোনো সুস্থ সংস্কৃতি নয়, বরং এটি স্পষ্ট র‍্যাগিং। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় এবং লোকলজ্জার ভয়ে এতদিন তথ্য প্রকাশ না পাওয়ায় এই ব্যাধি জবি বাসগুলোতে রীতিমতো ডালপালা মেলেছে।


​ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রুটের বাসে সক্রিয় হয়ে ওঠে সিনিয়রদের একটি নির্দিষ্ট অংশ। শৃঙ্খলা শেখানোর অজুহাতে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বাসের সামনে ডেকে আনা হয়। কেউ নিজের আগ্রহে গান বা আবৃত্তি করলে তা স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হলেও কেউ আপত্তি জানালে শুরু হয় মানসিক চাপ।

​অভিযোগ রয়েছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাছোড়বান্দার মতো জুনিয়রদের বাধ্য করা হয় সবার সামনে পারফর্ম করতে। সম্প্রতি এক থার্ড ইয়ারের শিক্ষার্থীকেও ফার্স্ট ইয়ার মনে করে হেনস্থা করার চেষ্টা করা হয় যা প্রমাণ করে তাদের ব্যবহার কতটা অসহনীয়। বাসগুলোর এই পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ভীতি ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করছে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তথাকথিত পরিচিতি পর্বের নামে এই জোরপূর্বক কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের ওপর মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রথমত, সবার সামনে জোর করে দাঁড় করিয়ে হাসির পাত্র বানানোর ফলে অনেক শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে, যা তাদের তীব্র মানসিক ট্রমা ও হীনম্মন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ক্লাসে যাওয়ার শুরুতেই বাসের ভেতরে এমন তিক্ত ও অপমানজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা সারাদিন এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে কাটায় যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগহীনতা ও একাডেমিক ফলাফলে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বাসের এই অস্বস্তিকর ও ভীতিময় পরিবেশের কারণে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন ব্যবহারের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। র‍্যাগিংয়ের এই বাসভীতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় অপচয় করে বিকল্প উপায়ে যাতায়াত করছে যা তাদের ছাত্রজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।

​নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন রুটের বাসের কয়েকজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী তাদের ক্ষোভ ও অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন:

উত্তরণ বাসের এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, 
"র‍্যাগিংয়ের এই মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমি এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে উঠি না। প্রতিদিন অতিরিক্ত টাকা খরচ করে কষ্ট করে রিকশা ও লোকাল বাসে ভার্সিটিতে আসি। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে কেন এত ভয় নিয়ে চলতে হবে?"

​প্রজন্ম-২ বাসের আরেক শিক্ষার্থী জানান, 
"আমি ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত বাতাস পাব। কিন্তু বাসে ওঠার পর সিনিয়রদের একাংশ যেভাবে জোর করে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে হাসির পাত্র বানায়, তাতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। প্রতিবাদ করলে বাসে টেকা দায় হবে ভেবে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়।"

আরও পড়ুন

​প্রজন্ম-১ ও অনির্বাণ বাসের শিক্ষার্থীরা জানান:
"সব সিনিয়র খারাপ নন। অনেকেই অনেক ফ্রেন্ডলি। কিন্তু গুটি কয়েক সিনিয়রের এই রঙ্গতামাশার কারণে পুরো বাসের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।"


​এই অপসংস্কৃতি দূর করতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) এবং ক্রিয়াশীল সকল ছাত্রসংগঠন আইনি ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। 

এই ব্যাপারে জকসু পরিবহন সম্পাদক মাহিদ বলেন, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের বিভিন্ন সংস্কৃতি, যেটিকে আমরা পরিচয় পর্ব বলি। এর মাধ্যমে নতুন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করার একটি চর্চা হয়ে আসছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং পরিবহন দপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা শুরু থেকেই বিষয়টি তদারকি করার চেষ্টা করেছি। নতুন শিক্ষার্থীরা যখন বাসে আসা-যাওয়া শুরু করে, তখন বাসগুলো ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে আমরা প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বাসে ঘুরে ঘুরে তদারকি করেছি এবং সবাইকে সতর্ক করেছি যেন এ ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।


​তিনি আরো বলেন, "বাসের মূল সমস্যাটি তৈরি হয় গাড়ি চলাচলের সময়। গাড়ি রান করার পর দূর-দূরান্তে যাওয়ার পথে এমন অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী ভয়ে বিষয়টি সরাসরি আমাদের বা প্রশাসনকে জানায় না। আমাদের পরিবহন দপ্তরের পক্ষ থেকে বাসের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বাস কমিটিগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রক্টোরিয়াল বডির নিকট হস্তান্তর করা হয়।
​বিশ্ববিদ্যালয় একটি অনাবাসিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বাসের ভেতরে সব সময় তদারকি করা কঠিন। তাই বাসের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিটি বাসেই শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে একটি কমিটি গঠন করা থাকে। তাদের মাধ্যমেই আমরা বাসগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে শিক্ষার্থীরা ভীতি কাটিয়ে যদি অভিযোগ প্রদান করে কিংবা সিনিয়র-জুনিয়ররা সচেতন হয়, তাহলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই র‍্যাগিংয়ের সংস্কৃতি চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হবে।"


এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও পরিবহনে যেকোনো ধরণের র‍্যাগিং বা মানসিক হয়রানির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
​জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নাসির উদ্দিন বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে যেকোনো ধরণের র‍্যাগিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান একেবারেই পরিষ্কার—বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রকার র‍্যাগিং সহ্য করা হবে না।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পরিচয় পর্বের নামে জবি বাসে 'র‍্যাগিং', ক্ষোভ ও মানসিক যন্ত্রণায় শিক্ষার্থীরা

সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া গ্রেফতার না করার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে নিয়োগ, থাকছে ফ্রেশার প্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ

রানার গ্রুপে নিয়োগ, আবেদন অনলাইনে

আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন নেইমার

গাংনীতে পৃথক দুটি বাড়ির প্রবেশ পথ থেকে বোমা সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধার