সুন্দরবনের কান্না: অস্তিত্বের লড়াইয়ে এক বিস্ময় বনভূমি
পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন একই সাথে অপার বিস্ময় ও অফুরন্ত জীববৈচিত্র্যের এক বিশাল ভান্ডার। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, এবং নানা প্রজাতির পাখ—পাখালির কলকাকলিতে মুখর এই বনভূমি বাংলাদেশের গর্ব ও প্রাকৃতিক সুরক্ষার এক অমোঘ প্রাচীর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা আর প্রাকৃতিক নানা সংকটে আজ এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী বনভূমির জীবনচক্র বিপন্ন। সুন্দরবনের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি প্রাণ, বাঘ থেকে শুরু করে প্রায় বিলুপ্ত ঘড়িয়াল, জলপথের শান্ত ডলফিন থেকে শুরু করে বিরলতম কচ্ছপ সকলেই আজ কঠিন সংকটের মুখোমুখি।
সুন্দরবনের আত্মা: সুন্দরী ও গেওয়া সুন্দরবনের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এর প্রধান বৃক্ষ ‘সুন্দরী’। এই গাছের শ্বাসমূল বা নিউম্যাটোফোর মাটির উপরে উঠে এসে বনের লবণাক্ত পরিবেশে অক্সিজেন গ্রহণ করে, যা ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এই সুন্দরী গাছই সুন্দরবনকে তার নাম ও পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা এই গাছের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে উঠেছে। উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে বনের গভীরেও লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে, যা সুন্দরী গাছ সহ্য করতে পারে না। ফলে, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ‘আগা মরা’ রোগ, যেখানে গাছের উপরের অংশ মরে গিয়ে ধীরে ধীরে পুরো গাছটিই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে সংকটে আছে ‘গেওয়া’ গাছ। এই গাছটি অপেক্ষাকৃত বেশি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারলেও এর বৃদ্ধি ও বিস্তারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জীবিকার উৎস: গোলপাতা সুন্দরবন উপকূলের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা সরাসরি জড়িয়ে আছে ‘গোলপাতা’ গাছের সঙ্গে। এই পাম জাতীয় উদ্ভিদের পাতা দিয়ে ঘরের ছাউনি তৈরি হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোলপাতা মূলত নদীর ধারে, কম লবণাক্ত ও কাদা মাটিতে জন্মায়। কিন্তু লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নদী ভাঙনের ফলে গোলপাতার বনও ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, যারা বংশপরম্পরায় ‘বাওয়ালি’ হিসেবে গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা আজ কাজ হারাচ্ছেন। গোলপাতার ঝাড় কমে যাওয়া মানে শুধু মানুষের জীবিকার সংকট নয়, এটি মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর নার্সারি ক্ষেত্র হিসেবেও তার গুরুত্ব হারাচ্ছে।
রাজকীয় বাঘ: অস্তিত্বের লড়াই সুন্দরবনের প্রতীক নিঃসন্দেহে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। স¤প্রতি ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪ থেকে বেড়ে প্রায় ১২৫টিতে দাঁড়িয়েছে, যা কিছুটা আশার সঞ্চার করে। চোরাচালান রোধ, বন বিভাগের তৎপরতা এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। তবে এই সামান্য বৃদ্ধিই বাঘের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করে না। বাঘের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো তার আবাসস্থল সংকোচন এবং খাদ্য সংকট। সমুদ্রের স্তর বাড়ার কারণে সুন্দরবনের মিষ্টি পানির উৎসগুলো লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। এতে করে বাঘের প্রধান শিকার চিত্রা হরিণের সংখ্যা কমছে, যা বাঘকে খাবারের জন্য লোকালয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং মানুষ—বাঘ সংঘাত বাড়াচ্ছে।
মুখোশধারী ফিনফুট: আড়ালে থাকা বিপন্ন পাখি সুন্দরবনের অন্যতম রহস্যময় ও বিপন্ন পাখি হলো ‘মাস্কড ফিনফুট’ বা মুখোশধারী ফিনফুট। জলাভূমির ধারে, গাছের নিচু ডালে বাসা বাঁধা এই পাখিটি এতটাই বিরল যে এর দেখা পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। বন উজাড়, নদীর তীরে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এদের আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই পাখির টিকে থাকা নির্ভর করে সুন্দরবনের নীরব ও শান্ত পরিবেশের ওপর, যা আজ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। মুখোশধারী ফিনফুটের সংকট প্রমাণ করে যে, সুন্দরবনের বিপদ কেবল বড় প্রাণীদেরই নয়, আড়ালে থাকা ছোট ও নিরীহ প্রাণীদের জন্যও সমানভাবে সত্য। শুধুমাত্র বাঘ, ঘড়িয়াল বা ডলফিন নয়, সুন্দরবনের পুরো ইকোসিস্টেমই আজ হুমকির মুখে। এর প্রধান কারণগুলো হলো: দূষণ: শিল্প—কারখানার বর্জ্য, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত কীটনাশক এবং পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য সুন্দরবনের পানি ও মাটিকে বিষাক্ত করে তুলছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে বলে পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মানুষের ওপর নির্ভরশীলতা: সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বিশাল এক জনগোষ্ঠী যারা মধু, কাঠ ও মাছ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বনজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ শিকার ও গাছ কাটা বনের ভারসাম্য নষ্ট করছে। সুন্দরবনকে রক্ষা করা কেবল একটি দেশের দায়িত্ব নয়, এটি একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। এই সংকট মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক: কঠোর আইন প্রয়োগ: বাঘ শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচার রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বন অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বনরক্ষীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। জলবায়ু অভিযোজন: লবণাক্ততা সহনশীল বৃক্ষরোপণ এবং মিষ্টি পানির আধার সংরক্ষণের মতো জলবায়ু অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ: শিল্প—কারখানার বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা করা এবং সুন্দরবনের আশেপাশে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো প্রকল্প অনুমোদন না দেওয়া। বিকল্প জীবিকা: সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প ও টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বনের ওপর তাদের চাপ কমে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: সুন্দরবন রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। ইউনেস্কো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।
আরও পড়ুনসুন্দরবন কেবল কিছু গাছপালা আর পশুপাখির আবাসস্থল নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বর্ম যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে। এই বনভূমির সংকট মানে বাংলাদেশেরই সংকট। বাঘের গর্জন, ডলফিনের খেলা বা পাখির কলতান যদি স্তব্ধ হয়ে যায়, যদি ঘড়িয়াল বা বাটাগুর কচ্ছপের মতো অনন্য প্রাণী হারিয়ে যায়, তবে তা হবে মানবজাতির জন্য এক লজ্জার অধ্যায়। তাই সময় থাকতেই আমাদের জাগতে হবে। সুন্দরবনকে তার সবটুকু মহিমায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা আজ সময়ের দাবি।
লেখক :
হেনা শিকদার
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








