ভিডিও শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:১০ পিএম

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ এক্সিট নীতিমালা: খেলাপি ঋণের সমাধান, নাকি নতুন নৈতিক ঝুঁকি

বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের সংকট এখন শুধু অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক তুলনাতেও এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এক অভূতপূর্ব খেলাপি ঋণ সংকটের চিত্র তুলে ধরে। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশের কাতারে এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও শীর্ষে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকের তারল্য, মূলধন, নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা এবং কোটি কোটি আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর সতর্ক সংকেত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বিশেষ এক্সিট’ (Special Exit)  বা এককালীন সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি (One-Time Settlement ev OTS)  নীতিমালা চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণের একটি অংশ উদ্ধার করে ব্যাংকিং খাতে তারল্য ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আনা। উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। 

ওয়ান—টাইম সেটেলমেন্ট বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। অতীতেও পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও সমঝোতার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু খেলাপি ঋণ কমেনি। ফলে প্রশ্ন ওঠে, সমস্যাটি নীতিমালায়, নাকি বাস্তবায়নে? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় অনুরূপ ব্যবস্থা থাকলেও তা কঠোর আইন, স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে তাইওয়ান, বেলজিয়াম ও সুইডেনের মতো দেশে শক্তিশালী তদারকি ও কার্যকর আইন প্রয়োগের কারণে খেলাপি ঋণের হার ১ শতাংশেরও নিচে। এসব অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয় যে কার্যকর সুশাসন, শক্তিশালী তদারকি ও জবাবদিহিতাই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। নতুন নীতিমালার প্রথম প্রশ্ন এককালীন পরিশোধের শর্ত নিয়ে। দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ একজন ঋণগ্রহীতা একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন? আবার যদি সেই সক্ষমতা থেকেই থাকে, তবে এতদিন ঋণ অনাদায়ী থাকার কারণ কী? সার্কুলারে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরোপিত সুদ মওকুফ। অনারোপিত সুদ ব্যাংকের আয় হিসেবে গণ্য না হওয়ায় তা মওকুফে জটিলতা কম। কিন্তু আরোপিত সুদ ইতোমধ্যে আয় হিসেবে স্বীকৃত, যার ভিত্তিতে কর পরিশোধ ও অনেক ক্ষেত্রে লভ্যাংশ বিতরণ করা হয়েছে। পরে সেই সুদ মওকুফ হলে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা, মূলধন পর্যাপ্ততা, আর্থিক বিবরণীর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কর সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। অথচ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের নিয়ে। সার্কুলারে তাদের এই সুবিধার বাইরে রাখার স্পষ্ট বিধান নেই। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া উদ্যোক্তা এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তিকে একইভাবে বিবেচনা করা হলে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে। একই ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাংক ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে সমতা ও ন্যায্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই এ ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন কাঠামো অপরিহার্য। 

এ নীতিমালার আরেকটি দিক হলো নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের প্রতি এর বার্তা। দীর্ঘদিন সময়মতো ঋণ পরিশোধকারীরা যদি দেখেন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হতে পারে। অর্থনীতিতে একে মোরাল হ্যাজার্ড (Moral Hazard)  বা নৈতিক ঝুঁকি বলা হয়। তাই নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হারে ছাড়, দ্রুত ঋণ অনুমোদন কিংবা উন্নত ক্রেডিট রেটিংয়ের মতো ইতিবাচক প্রণোদনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। 

তবে নীতিমালাটির পক্ষে বাস্তবসম্মত কিছু যুক্তিও রয়েছে। বহু খেলাপি ঋণ বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকে এবং কোনো অর্থই উদ্ধার হয় না। সে তুলনায় সমঝোতার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অংশ আদায় করা গেলে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে এবং অর্থনীতিও উপকৃত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ১৮ মাসের সংস্কার কর্মপরিকল্পনা, Expected Credit Loss (ECL) ভিত্তিক প্রভিশনিং, নতুন ঋণ আদালত আইন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (Asset Management Company- AMC) গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

বিশেষ এক্সিট নীতিমালা স্বল্পমেয়াদে কিছু খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এর সফলতা নির্ভর করবে কত টাকা আদায় হলো তার চেয়ে বেশি, কতটা ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে এটি বাস্তবায়িত হলো তার ওপর। দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রকৃত সংকটে পড়া উদ্যোক্তাকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে হবে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রতি কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল ঋণ বিতরণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং ন্যায়সংগত নীতি, কার্যকর জবাবদিহিতা এবং ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতির ওপরই তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে।

লেখক :

ফারুক আহম্মেদ

প্রাবন্ধিক—সাবেক ব্যাংকার 

 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায় এক শিশুসহ নিহত ৩

ইনিংস ব্যবধানে হারের পর যা বললেন সিমন্স

 নাটোরে ভটভটি-বাস মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই ভাইসহ নিহত ৩

বিশ্বকাপে মেসিকে হত্যার হুমকির ভয়ঙ্কর তথ্য ফাঁস!

বিশ্বকাপে মেসিকে হত্যার হুমকির ভয়ঙ্কর তথ্য ফাঁস!

উন্নত চিকিৎসার জন্য যেন দেশের মানুষকে বিদেশমুখী হতে না হয় : প্রধানমন্ত্রী