উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত
বগুড়ার তালোড়ায় ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের কৃষিখাতকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতাপূর্ণ করতে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দিতে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়ায় একটি বিশেষায়িত ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল বিষয়ে যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তাতে তালোড়াকে একটি আদর্শ স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও চর্তুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে তালোড়াই এই প্রকল্পের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। সরকারের জাতীয় নীতি অনুযায়ী তিন-ফসলি ও উর্বর কৃষিজমি নষ্ট না করে শিল্পায়নের যে তাগিদ রয়েছে, তালোড়া তার একটি আদর্শ উদাহরণ। তালোড়া পৌরসভার চাষযোগ্য জমির একটি বড় অংশ অনুৎপাদনশীল ও একফসলি। নাগর নদীর তীরবর্তী অনুৎপাদনশীল এলাকা, প্রায় ৪৩ একর সরকারি খাস জমি এবং রেলওয়ের ১৫ একর অব্যবহৃত জমিকে ভরাট করে সহজেই এখানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব।
তালোড়ার ভৌগোলিক অবস্থান একে প্রাকৃতিকভাবেই একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এটি বগুড়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী এবং গাইবান্ধা জেলার অন্যতম প্রধান সংযোগস্থল। এই উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী জেলাগুলো থেকে কম খরচে দ্রুত কাঁচামাল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এখানে খুবই সহজ হবে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলে পণ্য পরিবহন খরচ কমানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তালোড়াকে কেন্দ্র করে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব সুযোগ রয়েছে। তালোড়া থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কটি সরাসরি যুক্ত হয়েছে ঢাকা-রংপুর ৪-লেন জাতীয় মহাসড়কের সাথে। ফলে রাজধানী ঢাকা কিংবা বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাথে যাতায়াতের সময় প্রায় অর্ধেক কমে আসবে।
এর মাত্র ২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে রয়েছে দেশের বৃহত্তম রেল হাব সান্তাহার রেল জংশন এবং কৌশলগত পয়েন্ট প্রস্তাবিত রানীরহাট জংশন। সান্তাহার-বগুড়া রেলপথটি ডুয়েলগেজ হওয়ায় কার্গো ট্রেনের মাধ্যমে দক্ষিণবঙ্গের মোংলা পোর্ট ও খুলনার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন সম্ভব। উচ্চমূল্যের এবং দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য (যেমন: বিশেষায়িত শাকসবজি, ফল ও ফুল) আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে বিমান যোগাযোগ অপরিহার্য। তালোড়া থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরত্বের প্রস্তাবিত বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে ‘এগ্রো-বেজড কার্গো সার্ভিস’-এর মাধ্যমে সরাসরি বিশ্ববাজারে পণ্য পাঠানো যাবে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি এবং ধুনটে নদীবন্দর স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের লজিস্টিকস সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করবে।
আরও পড়ুনতালোড়া ছাড়াও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাগদাফার্ম এলাকায় কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চলের উপযোগিতা যাচাই করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাগদাফার্মে এই অঞ্চল করা হলে বিমানবন্দর ও নদীবন্দর অনেক দূরে পড়বে এবং রেল যোগাযোগও হবে একমুখী। ফলে সেটি তালোড়ার মতো লাভজনক হবে না।
"বগুড়া উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু। সান্তাহার রেল জংশনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে আম এবং বগুড়া, জয়পুরহাট বা রংপুর থেকে আলু অনায়াসে আনা সম্ভব। সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর বা চিলাহাটি থেকেও ট্রেন সরাসরি এখানে আসতে পারে। যেহেতু এখান থেকে সড়ক, আকাশ, নদী ও রেলচারটি পথই সুবিধাজনক, তাই পল্লী উন্নয়ন একাডেমী তালোড়ায় কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল স্থাপনের পক্ষে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করেছে।”
পল্লী উন্নয়ন একাডেমী বগুড়ার মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক জানান, বগুড়া উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্র বিন্দু। এছাড়াও সান্তাহার রেল জংশন এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ থেকে অনায়াসে আম আনা সম্ভব। এছাড়াও বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুরের আলু রেলপথে ও সড়কপথে আনা সম্ভব। ফলে তালোড়া একটি লাগসই স্থান। উল্লাপাড়া হয়ে সিরাজগঞ্জের কৃষিপন্য সহজেই তালোড়া নেওয়া সম্ভব। এছাড়াও রংপুর দিনাজপুর, চিলাহাটি, রাজশাহী, ঈশ্বরদী থেকে ট্রেন সরাসরি আসতে পারে। তিনি বলেন কৃষিপন্য রপ্তানি অঞ্চল এমন স্থানেই হওয়া বাঞ্ছনীয় যেখান থেকে সড়কপথ, আকাশ পথ, নদীপথ, রেল যোগাযোগ সহজ। একারনে পল্লীউন্নয়ন একাডেমী তালোড়ায় কৃষিপন্য রপ্তানি অঞ্চল স্থাপনের পক্ষে সুপাািরশ মালা দিয়েছে।
একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্প ও কৃষির সুসমন্বয় প্রয়োজন। তালোড়ায় ‘কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা কেবল একটি আঞ্চলিক দাবি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুবিধা ব্যবহার করে এই অঞ্চলটি দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম। সরকারের উচিত এই কৌশলগত উদ্যোগটিকে দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের লজিস্টিক খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
মন্তব্য করুন

_medium_1783958147.jpg)
_medium_1783957760.jpg)



_medium_1783955692.jpg)


