ভিডিও শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৪ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৫২ পিএম

সুশাসন চর্চা থেকে অবিচল আস্থা: ব্র্যাক ব্যাংক যেভাবে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক হলো

তারেক রেফাত উল্লাহ খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো।

 ১. ব্র্যাক ব্যাংক গত ২৫ বছরের যাত্রায় কী কী অর্জন করেছে?

 উত্তর: স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশের ‘মিসিং মিডল’ বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের অর্থায়ন সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে। গত ২৫ বছরের যাত্রায় আমরা ২০ লাখেরও বেশি এসএমই উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করেছি। এই অর্থায়ন দেশে এক কোটিরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। এটিই প্রমাণ করে যে, আমরা জনগণকে কেবল সাধারণ ব্যাংকিং সেবাই দিইনি, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় অবদান রাখতে পেরেছি।

দীর্ঘ এই সময়ে আমরা দেশের ২,৩০০-এরও বেশি লোকেশনে আমাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছি, যার ফলে আমাদের গ্রাহকেরা এখন দ্রুততম সময়ে যেকোনো সেবা পাচ্ছেন। গ্রাহকসেবাকে আরও আধুনিক করতে আমাদের ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে, যেখানে এখন প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। গ্রাহকদের এই অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসে ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল পোর্টফোলিও আজ ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এছাড়া, আমাদের সাবসিডিয়ারি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ দেশের ৮ কোটি মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছি।

কর্পোরেট ব্যাংকিংয়েও আমরা দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংকে পরিণত হয়েছি। বর্তমানে আমাদের কর্পোরেট গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ‘কর্পনেট’-এ প্রতি মাসে গড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে।

২৫ বছরের ব্যবধানে ব্র্যাক ব্যাংকের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ১ বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্ক পার করে পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ ব্যাংকে। একই সঙ্গে আমাদের শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি এবং ফরেক্স পোর্টফোলিও থাকায় আমরা বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নও করতে পারছি। এরই মধ্যে একটি ‘আফ্রাম্যাক্স ওয়েল ট্যাঙ্কার’ কেনার জন্য আমরা এককভাবে প্রায় ৯৬ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন করেছি, যা এখন পর্যন্ত দেশের জাহাজশিল্পে একক কোনো ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অর্থায়ন।

সব মিলিয়ে, ব্র্যাক ব্যাংক দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ও সুশাসিত ব্যাংক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি গ্রাহকদের সর্বোচ্চ আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। আমরা দেশের প্রতিটা মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক ও সহজলভ্য সেবা নিয়ে আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে আসতে কাজ করে যেতে চাই। এককথায় আগামী দিনগুলোতে আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের মোস্ট ইমপ্যাক্টফুল ব্যাংক হয়ে ওঠা। পাশাপাশি আমরা ব্যাংকের কাজ করার ধরণ, মনোভাব ও অনুশীলনকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে দেশীয় মালিকানাধীন প্রথম ‘মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক’ হয়ে ওঠতে পারি।

গত ২৫ বছরে যেসব ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক বাংলাদেশে Number 1 হয়েছে তা হলো:

  • Market Capitalization (More than USD 1 billion)
  • Capital base (BDT 10,000 crore)
  • Foreign investor shareholding (35.89%)
  • Retail assets (BDT 12,563 crore)
  • Collateral-free CMSME lending
  • Offshore Banking Assets (USD 1.3 billion)
  • Mobile Financing services by subsidary bKash (8 crore users)
  • Institutional shareholding (46.16% by BRAC)
  • Non-performing loan (2.27%)
  • International credit rating (S&P ‘B+’ and Moody’s ‘B2’)
  • Bloomberg ESG Rating (3.8)

২. বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নিরাপদ ব্যাংক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার মনে হয়েছে?

উত্তর: নিরাপদ ব্যাংক নিয়ে বলতে গেলে আমাদের প্রথমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নজর দিতে হবে। গত কয়েক দশক ধরে সবার মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা ছিল, ব্যাংকে টাকা রাখা মানেই তা নিরাপদ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু ব্যাংকে উদ্ভূত পরিস্থিতি এই চিরাচরিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে। ফলে, আমানতকারীরা এখন তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় জমা রাখার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন হয়ে উঠেছেন।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলধন হয়ে উঠেছে ‘আস্থা’। শুধুমাত্র চোখধাঁধানো ব্র্যান্ডিং বা তুমুল প্রচারণায় এই আস্থা অর্জন করা যায় না। শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, আর্থিক স্থিতিশীলতা, নিয়মতান্ত্রিক আইন প্রতিপালন এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই কেবল গ্রাহকদের কাছে একটি ব্যাংকের বিশ্বস্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়।

একটি ব্যাংক কতটা নিরাপদ, তা বোঝার জন্য সবার প্রথমে ব্যাংকের স্পন্সরদের গুণগত মান এবং করপোরেট সুশাসনের কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। কারণ, যেসব ব্যাংকের সুশাসন শক্তিশালী, তারা যেকোনো অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্যদের তুলনায় বেশি সক্ষম হয়। ব্র্যাক ব্যাংকের স্পন্সরশিপের একটি বড় অংশ রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর অধীনে। একই সঙ্গে আমাদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বেশিরভাগই আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ স্বাধীন বা নন-শেয়ারহোল্ডার পরিচালক। ফলে, ব্র্যাক ব্যাংক যেকোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা করপোরেট স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে শতভাগ সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এবং অন্যান্য স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বিবেচনায় ‍নিতে হবে। এগুলো একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দায়বদ্ধতা মেটানোর যোগ্যতার প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে তুলে ধরে। উল্লেখ্য, ব্র্যাক ব্যাংক বিশ্ববিখ্যাত ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’ এবং ‘মুডিস রেটিংস’-এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং পাওয়া বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক।

তৃতীয়ত, একটি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান সমান গুরুত্ব রাখে। কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেশি হলে বুঝে নিতে হবে ওই ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা দুর্বল। ২০২৫ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল ৩০%-এরও বেশি, সেখানে ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত মাত্র ২.২৭%-এ নেমে এসেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

এছাড়া, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, মূলধনের পর্যাপ্ততা, মুনাফা এবং সামগ্রিক ব্যালেন্স শিটের শক্তির মতো মূল আর্থিক সূচকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এই সূচকগুলো ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চাপ সহ্য করার এবং গ্রাহকসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সক্ষমতা প্রকাশ করে। এই ধরনের প্রতিটি সূচকেই অনেক এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংক। যেমন: তারল্য পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক ‘অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও’ মাত্র ৬৩%-এ নামিয়ে এনেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এর অর্থ হলো, আমরা যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতেও গ্রাহকদের আমানত চাহিদামাত্র তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত দেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা রাখি। এছাড়া, আমাদের মূলধন ভিত্তি এখন ১০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা ব্যাংকের শক্তিশালী ভিতকে প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২,২৫১ কোটি টাকা (কর-পরবর্তী) নিট মুনাফা করেছে, যা আমাদের ধারাবাহিক কর্মকান্ডের প্রতিফলন।

সবশেষে, একটি ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, যেকোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে আমানতকারীরা সাধারণত তাদের জমানো টাকা এমন সব ব্যাংকে সরিয়ে নেন, যেগুলোকে তারা সবচেয়ে নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য মনে করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংক খাতের আমানত প্রবৃদ্ধি যেখানে মাত্র ১১.৫১% ছিল, সেখানে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ২৭.৫%। ২০২৫ সালে মাত্র এক বছরেই আমরা নতুন আমানত পেয়েছি ২১,০০০ কোটি টাকারও বেশি।

মূল কথা হলো, কোনো একক সূচক দিয়ে একটি ব্যাংকের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে আস্থা, সুশাসন, আর্থিক সক্ষমতা এবং আইনগত পরিপালনের মতো উপাদানগুলোর সমন্বিত রূপই নির্ধারণ করে কোনো ব্যাংক অনিশ্চয়তার সময়ে গ্রাহকদের জন্য ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না।

৩. জনগণের আস্থা অর্জন করে দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারা একটি নিরাপদ ব্যাংক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: এক কথায় যদি বলি— করপোরেট সুশাসন। এটি এমন এক মজবুত ভিত্তি, যার ওপর আস্থা, প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠে। সুশাসন বজায় রাখতে পারলে একটি ব্যাংক সুষ্ঠু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং টেকসই মূল্যবোধ তৈরিতে অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আর যদি এই জায়গায় আপস করা হয়, তাহলে বিপুল মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি বা আকর্ষণীয় বিপণন কৌশল— কোনো কিছুই সেই প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে পারে না।

আরও পড়ুন

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বিষয়টি নিয়ে আলাদা আলোচনা হয় না। কারণ, সেখানে ধরেই নেওয়া হয় যে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন থাকবেই। তবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিত করতে হয়। একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ, কার্যকর তদারকি, সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, রেগুলেটরি পরিপালন, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের মতো অপরিহার্য উপাদানগুলো দিয়েই নিশ্চিত হয় এই সুশাসন।

এদের মধ্যকার সম্পর্কটা খুবই সরল। সুশাসন আস্থা তৈরি করে। আস্থা গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের আকৃষ্ট করে। আর এই ধারাবাহিক আস্থাই একটি ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেসব প্রতিষ্ঠান আস্থার সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটাতে পারে, শুধু তারাই অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজারের যেকোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়।

 ৪. দ্রুত আমানত বৃদ্ধির ফলে অনেক সময় খারাপ মানের ঋণ তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে সম্পদের গুণগত মান কমে যায়। এমন হওয়া ঠেকাতে আপনারা কীভাবে নিশ্চিত করছেন?

উত্তর: আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যেকোনো ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, সুদৃঢ় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা থাকলেই আমানতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে।

একটি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একক খাতের ওপর নির্ভর না করে ভিন্ন ভিন্ন খাতে ঋণ দেওয়া। বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক এখনো অল্প কিছু বড় করপোরেট ও বাণিজ্যিক ঋণগ্রহীতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এই মডেলে সমস্যা হলো, ঋণ তহবিলের বড় অংশ যখন নির্দিষ্ট কিছু ঋণগ্রহীতা বা খাতের সঙ্গে বাঁধা থাকে, তখন সামান্যতম নেতিবাচক পরিস্থিতিও পুরো প্রতিষ্ঠানের ব্যালেন্স শিটে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

অন্যদিকে, বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও ব্যাংককে অনেক বেশি স্থিতিশীলতা দেয়। করপোরেট, কমার্শিয়াল, এসএমই, রিটেইল ও কৃষি খাতের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকিগুলো অনেক বেশি কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

অবশ্য এই বৈচিত্র্যকরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার। দেশব্যাপী শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী উপস্থিতি এবং সারা দেশের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করার মতো কাজগুলো খুব সহজ নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে এটিই সবচেয়ে টেকসই পথ।

একই সাথে, এই প্রবৃদ্ধিকে সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে ঋণ বিতরণের প্রতিটি সিদ্ধান্ত একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো, কঠোর মূল্যায়ন এবং শক্তিশালী আন্ডাররাইটিং মানদণ্ডের আলোকে নিতে হয়। পাশাপাশি ধারাবাহিক পোর্টফোলিও মনিটরিং থাকলে ভবিষ্যতের উদীয়মান ঝুঁকিও আগে থেকে চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

ব্র্যাক ব্যাংকে আমরা আমানতের প্রবৃদ্ধি এবং সম্পদের গুণগত মানকে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে দেখি না, বরং একে অপরের পরিপূরক মনে করি এবং এসব আমানত ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকি। মূলত করপোরেট সুশাসন, ঋণ শৃঙ্খলা এবং বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও’র মেলবন্ধন থাকায় আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের সম্পদের মানকে উন্নত করার পাশাপাশি ব্যালেন্স শিটকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

৫. পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ যেখানে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে আপনার ব্যাংক কীভাবে সম্পদের গুণগত মান বজায় রাখতে পেরেছে?

উত্তর: এর অন্যতম কারণ হলো, বাজারের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, আমরা কখনো আমাদের মূল নীতিমালার সঙ্গে আপস করি না। ব্র্যাক ব্যাংক শুরু থেকেই সুশাসন, আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা থেকে কখনো সরে না এসে সম্পদের শক্তিশালী গুণগত মান বজায় রাখার মতো মূল ভিত্তিগুলো মেনে চলেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা এখানে অটল থেকেছি।

বাজার মাঝেমধ্যে লোভনীয় সুযোগ সামনে নিয়ে আসে। তবে আমাদের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরে এসেছি। ফলে সাময়িকভাবে আমাদের মুনাফা কিছুটা কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটিই আমাদের সম্পদের গুণগত মানকে সুরক্ষিত রেখেছে। এছাড়া একটি ব্যাংক জনগণকে সাধারণ ব্যাংক সেবার বাইরে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে কতটুকু ভূমিকা রাখছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এভাবেই ব্র্যাক ব্যাংক আজ দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৬. নিরাপদ ব্যাংক হয়ে উঠার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও সাইবার সিকিউরিটির গুরুত্ব কেমন? ব্র্যাক ব্যাংক কীভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে?

 উত্তর: একটি ব্যাংক কতটা নিরাপদ, তার একটা বড় অংশ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। কারণ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট তথ্য, লেনদেনের ইতিহাস, ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে শুরু করে সবকিছুই এখন ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হয়। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন ব্যাংকের মূল দায়িত্বের অংশ।

ব্র্যাক ব্যাংক এই বাস্তবতাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আমরা গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের পদ্ধতি অনুযায়ী সবক্ষেত্রে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন নিশ্চিত করি, যাতে অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো যায়। একইসঙ্গে আমাদের ডেটা এনক্রিপশন ও ডেটা লস প্রিভেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের জন্য আমরা এসওসি, এসআইইএম এবং এসওএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, যাতে যেকোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হচ্ছে।

গ্রাহকদের সাইবার ঝুঁকি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পরিচালিত হচ্ছে। কারণ প্রযুক্তিগত সুরক্ষা যতটা জরুরি, গ্রাহকের সচেতনতাও ততটাই জরুরি।

ব্র্যাক ব্যাংক এখানেই থেমে নেই। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ভিত্তিক অ্যানালিটিক্স ব্যবহার, ইনসিডেন্ট রেসপন্স সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ভিএপিটি ও রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম সম্প্রসারণ।

সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্সেও আমরা প্রস্তুত। আমাদের নিজস্ব সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমের যেকোনো ফিশিং, ম্যালওয়্যার ও ডেটা ব্রিচের মতো হুমকিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিজনেস কন্টিনিউটি ম্যানেজমেন্ট ও ডিজাস্টার রেসপন্স সক্ষমতাও আমরা নিশ্চিত করেছি। সবমিলিয়ে, ডিজিটাল নিরাপত্তাকে ব্র্যাক ব্যাংক সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই বিবেচনা করে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুশাসন চর্চা থেকে অবিচল আস্থা: ব্র্যাক ব্যাংক যেভাবে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক হলো

জুলাই স্মৃতি স্তম্ভে আগুন দেওয়ার চেষ্টা, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

নারী কর্মী নিয়োগ দেবে উত্তরা মটরস, কর্মস্থল ঢাকা

ফাইনালের আগে মুখোমুখি হতে পারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা

কুড়ালের আঘাতে বাবাকে হত্যার ঘটনায় প্রবাসী ছেলে গ্রেপ্তার

সজীব গ্রুপে ম্যানেজার পদে চাকরির সুযোগ