বগুড়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় লুকিয়ে আছে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
স্টাফ রিপোর্টার: উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু ও অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক শহর বগুড়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণ। বর্তমানে প্রতিদিন মহানগর এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি, কাঁচাবাজার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০ থেকে ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্য বের হচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্য শহরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সঠিক ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই মহাসমস্যাকে এক বিরাট অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিদিন জমা হওয়া ২০০ থেকে ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্যের সিংহভাগই পচনশীল জৈব বর্জ্য। এই বর্জ্যকে যত্রতত্র ফেলে না রেখে যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা যায়, তবে তা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পচনশীল বর্জ্য থেকে উচ্চমানের কম্পোস্ট বা জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। বগুড়া একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানকার ফসলি জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে যদি বর্জ্য থেকে উৎপাদিত কম খরচের জৈব সার ব্যবহার করা যায়, তবে কৃষকদের উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে আসবে এবং মাটির উর্বরতা রক্ষা পাবে।
বর্জ্য পচিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির মাধ্যমে রান্নার গ্যাস উৎপাদন করাও সম্ভব। এটি শহরের জ্বালানি চাহিদার একটি অংশ পূরণ করতে পারে। এই বর্জ্যের মধ্যে একটি বড় অংশ থাকে প্লাস্টিক, কাচ, কাগজ ও মেটাল। এগুলো আলাদা করে রিসাইক্লিং কারখানায় পাঠালে নতুন নতুন পণ্য তৈরি হবে, যা আমদানি নির্ভর কাঁচামালের ওপর চাপ কমাবে।
এদিকে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিন তাদের বিভিন্ন গার্বেজ ট্রাক ও ভ্যানের মাধ্যমে প্রায় ১০০ থেকে ১৬০ মেট্রিকটন বর্জ্য অপসারণ করতে পারে, যা শহরের অস্থায়ী বিভিন্ন ট্রান্সফার স্টেশন ও ভাগাড়ে নিয়ে ফেলা হয়। বাকি বর্জ্যের একটি বড় অংশ শহরের বিভিন্ন ড্রেন, খাল কিংবা উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকে।
বগুড়াকে একটি পরিচ্ছন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একটি সমন্বিত ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষঞ্জরা মনে করেন উৎসস্তরে বর্জ্য পৃথকীকরণ করতে হবে। প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময়ই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার জন্য নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর জন্য ভিন্ন রঙের ডাস্টবিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
আরও পড়ুনসিটি কর্পোরেশন একা এত বিশাল পরিমাণ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর মাধ্যমে বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পারে। এতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এছাড়াও শহরের বাইরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ‘ওয়েস্ট-টু-এনার্জি’ (বর্জ্য থেকে শক্তি) প্ল্যান্ট স্থাপন করা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিদিনের বর্জ্য রিসাইকেল ও সার তৈরিতে ব্যবহৃত হবে।
একটি পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠলে বগুড়ায় শত শত তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, সার উৎপাদন এবং বিপণন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার সংস্থান হবে।
সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং ডাম্পিং স্টেশনের সীমাবদ্ধতার কারণে যা শহরের বড় মাথাব্যথা, সঠিক ব্যবস্থাপনায় তা-ই হয়ে উঠতে পারে বগুড়ার অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি। পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি উভয় সংকটের এককালীন সমাধান লুকিয়ে আছে এই ‘বর্জ্য থেকে সম্পদ’ ধারণার মধ্যেই। এখন প্রয়োজন শুধু প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং নাগরিকদের সচেতনতা।
বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানান, বর্জ্য বগুড়া মহানগরের জন্য একটি বড় সমস্যা। আমরা পরিবহনের অভাবে সঠিক সময়ে শহরের বর্জ্য অপসারণ করতে পারছিনা। পরিবহনের চাহিদা পত্র দেওয়া হয়েছে। ট্রাক পেলে সেই সমস্যা দূর হবে। বর্জ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, এই বর্জ্য থেকে আমরা জৈব সার প্রস্তুত করতে পারি।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বগুড়ার মহাপরিচালক আব্দুল মজিদ এর সাথে আলোচনা হয়েছে। তারা কিছু বর্জ্য নিতে চেয়েছেন রিসাইকেলিং করার জন্য এছাড়াও একটি বেসরকারি উদ্যাক্তা প্রতিষ্ঠান বর্জ্য দিয়ে সার তৈরীর পরিকল্পনার কথা আমাদেরকে বলেছে। তা করা হলে বর্জ্য যেমন অপসারণ হবে তেমনি এ থেকে সিটি কর্পোরেশন আয়ও করতে পারবে। এর আয় সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব খাতে আসবে।
মন্তব্য করুন


_medium_1782315472.jpg)
_medium_1782315057.jpg)



