ভিডিও বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৭ জুন, ২০২৬ ০৫:১৫ এএম

মসলা গবেষণা কেন্দ্রে

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি মসলা 'ভ্যানিলা' এখন বগুড়ার মাটিতে!

বগুড়ার ভ্যানিলা চাষ গবেষণায় সফল বাণিজ্যিক উৎপাদনের অপেক্ষা

স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা চাষ করে বড় ধরনের সাফল্য পাওয়া গেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি মসলা হিসেবে পরিচিত ভ্যানিলা বিন চাষে আশানুরূপ ফলনও এসেছে। বর্তমানে এই চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর জন্য আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট গবেষক।

ভ্যানিলার আদি জন্মস্থান মেক্সিকোয়। সেখানকার ‘তোতোনাক’ আদিবাসীরা প্রথম এর চাষ শুরু করে। পরবর্তীতে ১৫ শতকে অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষেরা চকলেটের স্বাদ বাড়াতে ভ্যানিলা ব্যবহার শুরু করে এবং ১৬ শতকে এটি স্প্যানিশদের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছায়।

ভ্যানিলা চাষের আদিভূমি মেক্সিকো হলেও বর্তমানে উৎপাদনের শীর্ষ দেশ মাদাগাস্কার। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ভ্যানিলা একাই উৎপাদন করে এই দেশ (বার্ষিক প্রায় ৩ হাজার ১শ’ টন)। এখানকার ‘বুরবন ভ্যানিলা’ বিশ্বসেরা।

এরপর ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকোর অবস্থান। খাদ্য ও পানীয় শিল্প ভ্যানিলার সবচেয়ে বড় ব্যবহার ক্ষেত্র (প্রায় ৪৮ শতাংশ)। আইসক্রিম, চকলেট, কেক, পেস্ট্রি, বিস্কুট এবং বিভিন্ন ডেইরি প্রোডাক্টে ফ্লেভার হিসেবে এটি অপরিহার্য। এছাড়া প্রিমিয়াম কফি, কোল্ড ড্রিংকস এবং অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়তেও ভ্যানিলা এক্সট্র্যাক্ট ব্যবহার করা হয়।

প্রসাধন ও পারফিউম শিল্পে ভ্যানিলার মিষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী সুগন্ধের কারণে এটি বিশ্বের নামি-দামি ব্র্যান্ডের পারফিউমসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও ওষুধ ও স্বাস্থ্যখাত ভ্যানিলার মূল উপাদান ‘ভ্যানিলিন’ একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো মানের ভ্যানিলা বিনের পাইকারি রপ্তানি মূল্য বর্তমানে প্রতি কেজি ৫০ থেকে থেকে ৮০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা)। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির বড় সাইজের ভ্যানিলা পড বা বিনের দাম মানভেদে প্রতি কেজি ১২০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

ভ্যানিলা মূলত একটি অর্কিডজাতীয় লতানো উদ্ভিদ, যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘ভ্যানিলা প্লানিফোলিয়া’। ভ্যানিলার গাছটি দেখতে গাঢ় সবুজ বর্ণের হলেও ফুলটির রঙ সাধারণত হলুদ রঙের। এটি মূলত এক ধরনের ফল, যা বরবটি বা শিমের মতো দেখতে।

আর সেই ফলের বীজ থেকেই তৈরি হয় সুগন্ধি ভ্যানিলা ফ্লেভার। বাংলাদেশ পুরোপুরি বিদেশি ভ্যানিলা ও কৃত্রিম এসেন্স আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তবে আমদানি নির্ভর এই ভ্যানিলা এখন বাংলাদেশে চাষ করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম ২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ভ্যানিলার কাটিং চারা এনে বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করেন। তিন বছর পর গাছে ফুল আসে এবং হাতে পরাগায়নের মাধ্যমে সফলভাবে ফলও পাওয়া যায়।

প্রতিটি গাছে একাধিক থোকায় ১৩ থেকে ১৫টি করে ফুল ধরে, যেগুলো ১৩ দিনের মধ্যে হাতে পরাগায়ন করতে হয়। ৭ থেকে ৯ মাসের মধ্যে ফল পরিপক্ব হয় এবং দেড় মাস ধরে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর তৈরি হয় ভ্যানিলা বিন।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম জানান, বর্তমানে তাদের গবেষণা কেন্দ্রে ৬০টির মতো গাছ আছে। ২০২৩ সালে প্রথম বছর একটি গাছ থেকে আড়াইশ’ গ্রাম, দ্বিতীয় বছর ১ কেজি এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে ৩ কেজির মতো ভ্যানিলা বিন উৎপাদন করতে পেরেছেন। এই গবেষক আরও জানান, ভ্যানিলা চাষ খুবই শ্রমসাপেক্ষ।

ফুল ফোটার পর প্রতিটি ফুলকে হাতে পরাগায়ন করতে হয় দুপুর ১২টার মধ্যে। এভাবে সফল পরাগায়নের পরই বিন পাওয়া সম্ভব। এরই মধ্যে ভ্যানিলা বিন থেকে এসেন্স তৈরির পরীক্ষাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রক্রিয়ায় বিনগুলোকে গরম পানির ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়, এরপর দুই মাস ধরে ধীরে ধীরে রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর ভ্যানিলা কালচে রঙ ধারণ করে এবং এর ভেতরের নরম অংশ থেকে তৈরি হয় প্রাকৃতিক এসেন্স। একটি বিন থেকেই পাওয়া যায় প্রায় এক টেবিলচামচ ভ্যানিলা এসেন্স। ভ্যানিলা গাছে ফল আসে মার্চ-এপ্রিলে, আর ফল পাকে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে। ফল পাকার পর এর ফ্লেভার বের করা হবে।

এই গবেষক বলেন, বর্তমানে তাদের গবেষণা কেন্দ্রে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও কোরিয়ার উন্নত জাত নিয়ে কাজ চলছে। তবে পিএইচডি গবেষণার জন্য ছুটিতে থাকায় কাজটি এগিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তারপরেও সুযোগ পেলেই তিনি গাছগুলোর তদারকি করছেন। বাণিজ্যিক চাষাবাদের সম্ভবনা নিয়ে জানতে চাইলে এই গবেষক জানান, গবেষণা পর্যায় থেকে কোন ফসল চাষি পর্যায়ে বা বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য কৃষি মন্ত্রাণালয়ের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়।

তবে সেক্ষেত্রে গবেষণা কার্যক্রমটি চালাতে হয় পাঁচ বছর। সেক্ষেত্রে ভ্যানিলার ফলন পাওয়া গেছে মাত্র তিন বছর, এখন আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম বলেন, ভ্যানিলা গাছে ফল নিয়ে আসতে একটি কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে একক ব্যক্তি পর্যায়ের এর সাফল্য অর্জন করা বেশ কঠিন। তবে গবেষণা কার্যক্রমের পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পের মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক চাষাবাদ সম্ভব।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ায় আশংকাজনক ভাবে প্রতিবছর কমছে কৃষি জমি

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৭ মাদকসেবীর কারাদন্ড

বগুড়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর তরুণ কুমার চক্রবর্তী জেলাহাজতে

‘এখন নিজেদের জুলাই যোদ্ধা বলতে লজ্জা লাগছে’

ঠাকুরগাঁওয়ে ধর্ষণ মামলার আসামির সম্পত্তি নিলামের নির্দেশসহ যাবজ্জীবন

পিকআপ চালকের ইটের আঘাতে ৩১ দিন পর পাম্প কর্মচারীর মৃত্যু