ভিডিও বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৪ মে, ২০২৬, ০৬:৩১ বিকাল

কঠিন সংকটেও গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়েছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক

নতুন বছরের শুরুতে ঝুঁকি কাটিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। সংকটের মধ্যেও ব্যাংকটিকে কখনো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো গ্রাহকের চেক ডিজঅনার হয়নি। বরং প্রতিনিয়ত উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা। অব্যাহত রয়েছে মুনাফা অর্জনের ধারা। কঠিন সংকটের মধ্যেও ব্যাংকের ডিপোজিট, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের লক্ষ্যে গ্রহণ করা কিছু রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের ফলে কতিপয় সূচক থমকে দাড়ালেও বর্তমানে সুফল আসতে শুরু করেছে। গত এক বছরে ঢেলে সাজানো হয়েছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম। সিস্টেম আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আরো নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। ফলে দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামী ব্যাংকটি ঘুড়ে দাড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

বিদায়ী অন্তবর্তী  সরকারের শুরুতে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকের আমানত সুরক্ষার লক্ষ্যে ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিবিঢ় পর্যবেক্ষণ ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিযুক্ত করা হয় স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে আছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে কিছু নেতিবাচক চিত্র। সরকারের তদারক সংস্থার পক্ষ থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। যার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৬ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এসব পরিস্থিতি ঘিরে ২০২৫ সাল জুড়েই নানান অস্থিরতায় ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক সংস্থার অডিটে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে বড় ধরনের অর্থিক লুটপাটের প্রমাণ মেলেনি। ফলে ব্যাংকটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘুরে দাড়াতে সক্ষম হয়।

গত বছর শেষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দেখা গেছে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আমানত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দাড়ায় ৫৪ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। এর অগের বছর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমানত ছিল ৫১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। সংকটময় পরিস্থিতি বিবেচনায় গত বছর আমানত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলেও কার্যত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আমানত বেড়েছে। একইভাবে গ্রাহক বা ব্যাংক হিসাব সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমানত একাউন্টের সংখ্যা দাড়ায় ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৭টি। এর আগের বছর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমানত হিসাব সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৪০টি। এক বছরের ব্যাবধানে একাউন্টের সংখা বেড়েছে ২ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমান ৫০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৪৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ৪ মাসে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ১ লাখ ৮০ হাজার একাউন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এপ্রিল মাস শেষে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আমানত হিসাব সংখ্যা দাড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪৫ হাজার। এ সময়ে বৈদেশিক বাণিজ্য হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার। বর্তমানে ব্যাংকের ডিপোজিট ও বিনিয়োগ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।   

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কখনোই তারল্য সংকটে পড়েনি। ফলে অন্যান্য বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোর মতো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের। ক্ষতিগ্রস্থ অনেক ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের গচ্ছিত অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। সেসব ব্যাংকে ৫/১০ হাজার টাকার চেকও অহরহ ডিজঅনার হয়েছে। এক্ষেত্রে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের কোন চেক ডিজঅনার হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। গ্রাহকের যেকোন পরিমান টাকার চেক সবসময়ে দিতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি। সংকটময় পরিস্থিতিতেও এমন কোনো প্রেক্ষাপট তৈরী হয়নি যে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের কোন গ্রাহক কোন শাখা থেকে তার কাঙ্খিত সেবা না পেয়ে ফিরে গেছেন। ফলে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে এই ব্যাংকটিকে নিয়ে আস্থার সংকট তৈরী হয়নি। কঠিন সময়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষের এ দক্ষতার বিষয়টি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশংসিত হয়েছে।

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের পথ সুগম হয়েছে। এতে শুরুতে কিছুটা ধকলের মুখোমুখি হলেও এখন সুফল আসতে শুরু করেছে। চলতি বছরের শুরুতেই ব্যাংকের সিস্টেম আপগ্রেডেশন করা হয়েছে। আধুনিক এ কোর ব্যাংকিং সিস্টেম “আবাবিল এনজি” চালুর ফলে লেনদেন এখন আরো নিরাপদ, দ্রুত,  নিরবিচ্ছিন ও স্থিতিশীল হয়েছে। এতে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং, এটিএম, বিএফটিএন, আরটিজিএস ও এনপিএসবি সেবার কার্যকরিতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যাংকটি ভবিষ্যতমুখী ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণে আধুনিক ও স্মার্ট যুগে প্রবেশ করেছে।

আরও পড়ুন

এছাড়া সারা বাংলাদেশের ৩০৬ টি উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ৭৩৮ টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে অগ্রনী ভুমিকা রাখছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। গত ১৬ মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একাউন্ট সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার। মোট আমানতের পরিমান ৪ হাজার ৭০ কোটি টাকা। এরমধ্যে শতকরা ৮৮ ভাগ আউটলেট গ্রামীন এলাকায় অবস্থিত। যার গ্রাহক ৪৯ ভাগ নারী।

এদিকে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠির উন্নয়নের লক্ষ্যে আল-আরাফাহ্ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এআরডিপি) আওতায় ২ হাজার ৭৮০টি গ্রামে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এ কর্মসূচীর সদস্য সংখ্যা ৮৬ হাজারের বেশি। এরমধ্যে ৭২ শতাংশ নারী। এর আওতায় গত ১৬ মাসে প্রায় ৩০ হাজার হিসাব সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এখন মোট হিসাব সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৯০০ টিতে দাড়িয়েছে। এই সময়ে আমানত বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বর্তমানে এই প্রকল্পের আমানত ৭৫০ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ৫৪১ কোটি টাকা।

একই সময়ে দেশের অন্যতম সমন্বিত শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। এরমাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইসলামিক ওয়ালেট, বাংলা কিউআর, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং এআরডিপি’কে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের  আওতায় আনা হয়েছে। এতে সঞ্চয়, দান, শিক্ষা ও বিনিয়োগ ক্যাশলেস করা সম্ভব হচ্ছে। এটিও একটি যুগান্তরকারী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে ২২৬টি শাখা, ৮৯টি উপশাখা ও ৭৩৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে আধুনিক গ্রাহকসেবা প্রদান করছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক।

ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ রাফাত উল্লাহ খান বলেন, আস্থা হারানো সহজ, কিন্তু ফিরে পাওয়া কঠিন। সেই কঠিন পথটাই ধীরে ধীরে অতিক্রম করছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। নানা চ্যালেঞ্জ, অস্থিরতা ও গুজবের মধ্যেও ব্যাংকটি গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে, এটাই সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। সংকটের সময়েও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি, কোনো গ্রাহকের চেক ডিজঅনার হয়নি, বরং আমানত, বিনিয়োগ ও গ্রাহক সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনা একটি প্রতিষ্ঠানকে আবারও শক্ত  ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে অগ্রগতি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অর্ন্তভূক্তি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আশাব্যঞ্জক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংকটকে লুকিয়ে না রেখে সংস্কারের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই চ্যালেঞ্জ আসে, কিন্তু সঠিক নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা ও গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্যোগ থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক তার একটি উদাহরণ হয়ে উঠছে। ইতিবাচক পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকুক, গ্রাহকের আস্থা আরও দৃঢ় হোক—এমনটাই প্রত্যাশা করেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ  রাফাত উল্লাহ খান।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কঠিন সংকটেও গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়েছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক

ঢাবিতে ডাকসুর উদ্যোগে প্রথমবারের মতো শনিবারের বাস ট্রিপ চালু

লাখাইয়ে বজ্রপাতের বজ্রপাতের সময় আতঙ্কিত হয়ে নদীতে পড়ে নিখোঁজ কৃষকের মরদেহ উদ্ধার

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৪৫৮তম পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত    

ক্রেডিট কার্ডহোল্ডারদের এক্সক্লুসিভ সুবিধা প্রদানে দি প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট- এর সাথে ব্যাংক এশিয়ার পার্টনারশীপ

সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পেছাল