বিশ্ব নাচে ছন্দময়, আসবে শান্তি কাটবে ভয়
আজ ২৯ শে এপ্রিল বিশ্ব নৃত্য দিবস, এই দিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেই মহান নৃত্য শিল্পী জ্যঁ জর্জেস নভেরা যার নামে এই দিনটি বিশ্বের সকল নৃত্য শিল্পীদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সপ্তদশ শতাব্দীতে ফ্রান্স এবং গোটা ইউরোপে নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্ত নৃত্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। তার জন্ম ১৭২৭ সালে ২৯ এপ্রিল প্যারিসে। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পর নভেরার অনুভূতিকে অনুসরণ করে ১৯৮২ সালে তার জন্মদিনে ২৯ শে এপ্রিলকে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেস্কো এই শিল্পীকে মহান করেছে। আজকের এই দিনে সকল নৃত্য শিল্পীদের জানাই আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসের শুভেচ্ছা। দিবসটি উদ্যাপন করা হয় ব্যালে নৃত্যের স্রষ্টা জ্যঁ জর্জেস নভেরের জন্মদিন উপলক্ষে। তখন থেকে পৃথিবীব্যাপী এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা হয়। বাঙালির জীবনে নৃত্য আনন্দ, প্রতিবাদ ও বিনোদনের এক অনন্য অভিব্যক্তি। এই দিনটি ১৯৮২ সালে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আই টি আই) এর নৃত্য কমিটি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো নৃত্যকে একটি সার্বজনীন শিল্পরূপ হিসেবে উদযাপন করা এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সমাজের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা। দিবসটি নৃত্যশিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি নৃত্যশিক্ষা ও নৃত্য পরিবেশনের সুযোগ প্রসারিত করার আহ্বান জানায়। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, কর্মশালা, প্রদর্শনী এবং পারফরম্যান্সের আয়োজন করা হয়। এই দিনটি পেশাদার নৃত্যশিল্পী থেকে শুরু করে সাধারণ নৃত্যপ্রেমীদের জন্যও একটি বিশেষ দিন যেখানে সবাই নৃত্যের আনন্দ ও সৃজনশীলতা ভাগ করে নিতে পারে। এই দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নৃত্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয় এটি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অভিব্যক্তি যা মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি ও ঐক্যের বার্তা বহন করতে পারে। বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে প্রতিবছর ২৯ এপ্রিল নানা উৎসব-আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হয়।
বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে এ দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয়ে আসছে। ইন্টারন্যাশনাল ডান্স কাউন্সিল বাংলাদেশ শাখা ও বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা যৌথভাবে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসের অনুষ্ঠান পালন করে। জ্যঁ জর্জেস নভেরের অবদানের স্বীকৃতির মাধ্যমে একদিকে যেমন নৃত্যের জন্য বিশেষ একটি দিন নির্ধারিত হয়, তেমনি এই গুণী শিল্পীকেও শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ তৈরি হয়। নৃত্য অত্যন্ত জটিল একটি ব্যাপার। নৃত্য ছবি ও রঙের মতো। চিত্রকর্মের বিচিত্র রূপের সঙ্গে নৃত্যের বিন্যাস ঘটে। পরে এর প্রকাশভঙ্গি আলোর সমকক্ষ চিন্তা করা যেতে পারে। সংগীত ব্যতীত নৃত্য বোধগম্য নয়। সৃজনশীল উপায়ে সব দেহটাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দেহের ছন্দকে মানুষের কাছে তুলে ধরা জরুরি। নৃত্যে আরো একটা জিনিসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন, সেটা হলো অভিব্যক্তি। এ ক্ষেত্রে আত্মার গতিশীল আলোড়ন ফুটে ওঠে মুখমন্ডলের মাধ্যমে। একজন নৃত্যশিল্পীকে অন্য দশজন মানুষ অপেক্ষা পৃথক হতে হবে। তাহলেই একজন শিল্পীর রুচি অন্যদের আকর্ষন করবে।
সব সংস্কৃতির আদি জননী হচ্ছে নাচ বা নৃত্য। নাচ সাংস্কৃতিক শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম। ফলে গবেষণা ও শিক্ষার উপাদান হিসেবে সারা বিশ্বেই নাচের জনপ্রিয়তা রয়েছে। নাচ মানুষের মেধা ও মননকে বিকশিত করে। নাচে দেহভঙ্গিমার মাধ্যমে শৈল্পিকভাবে পার্থিব ও অপার্থিব সব ভাবকে মানুষ প্রকাশের সুযোগ পায়। এ প্রকাশভঙ্গিতে থাকে গতি ও ছন্দ। সেই গতি ও ছন্দের তালে তালে ফুটে ওঠে প্রেম, ভালোবাসা, রাগ, অনুরাগ, প্রতিবাদ। সমাজ কিংবা গল্প-ইতিহাসের কথাও নাচের মাধ্যমে উঠে আসে। নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায় জীবনের কথা, চাওয়া-পাওয়া বা না-পাওয়ার কথা। সব মিলিয়ে নাচ শুধু বিনোদন নয়, নাচ জীবনের প্রতিবিম্বও।
নৃত্যকলা একটি গুরুমুখী বিদ্যা বা ঘরনা নির্ভর শিল্প। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে গুরু শিষ্যের এই পরম্পরা। সে পথেই আলো ছড়িয়েছেন আমাদের দেশের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা। তাদের আলোয় আলোকিত হয়েছে নৃত্যাঙ্গন। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি প্রয়াত যে সকল নৃত্য গুরুরা না ফেরার দেশে চলে গেছেন, তাদের মধ্যে মরহুম বুলবুল চৌধুরী, মরহুম গহর জামিল, মরহুম রওশন জামিল, মরহুম শাহেদ আলতামাস, নৃত্য গুরু মাতা মরহুম রাইজা খানম ঝুনু, মরহুম বজলুর রহমান বাদল, মরহুম আব্দুস সামাদ পলাশসহ আরো যে সকল নৃত্য গুরুরা না ফেরার দেশে চলে গেছেন তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এবং তাদের রুহের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং বর্তমানে যে সকল নৃত্য গুরুরা রয়েছেন এবং এই শিল্পকে নিয়ে কাজ করছেন তাদেরকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। আমাদের নৃত্য গুরুদের শেখানোর পথেই হেঁটে এগিয়ে চলছি আমাদের এই নৃত্যাঙ্গনে। আমাদের সংস্কৃতিতে নৃত্যে রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। স্বাধীনতাত্তোর এদেশের নৃত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ঠিক সেই সময় থেকে এ দেশের নৃত্য বিশ্বের দরবারে নিজের একটি শক্ত অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে। ধ্রুপদী নৃত্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উত্তোরন ঘটে এদেশীয় লোকনৃত্য ও গীত নৃত্যনাট্যের। এ নৃত্য ধারা দিয়ে এদেশে নৃত্য শিল্পীরা বহির্বিশ্বে নৃত্য পরিবেশন করে বাংলার সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল করেছে। এক্ষেত্রে অগ্রজ নৃত্য গুরুরা আমাদের যে নৃত্য শিল্পের পথ দেখিয়েছেন সে পথ দেখতেই আমরা নৃত্যকর্মীরা এই শিল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
আমরা যারা এই শিল্প নিয়ে কাজ করছি আমাদের সৃষ্টিশীল কাজ দিয়ে বাংলাদেশের সকল অগ্রজ নৃত্য গুরুদেরকে এই শিল্পে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়াত সকল নৃত্য গুরুসহ যারা এখনো এই শিল্প নিয়ে কাজ করছেন সে সকল নৃত্য গুরুদের প্রতি আবারও শ্রদ্ধা। আপনারা যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। আপনারা এই নৃত্য শিল্পের বাতিঘর। আপনাদের সৃষ্টিশীল কাজে আলোকিত হয়েছে নৃত্য শিল্প আর সেই আলোয় আলোকিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। জয় হোক নৃত্য শিল্পের, জয় হোক নৃত্য শিল্পীর। সকলকে নুপুরের শুভেচ্ছা।
আরও পড়ুনতথ্যসূত্র: প্রবেশিকা নীতি
লেখক :
মাহাবুব হাসান সোহাগ
নৃত্য শিল্পী ও নৃত্য পরিচালক
আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী বগুড়া।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








_medium_1777402096.jpg)