ভিডিও শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:৫৫ এএম

ঝুঁকিতে কর্মজীবী ও তরুণ প্রজন্ম

বগুড়ায় আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা সীমার চেয়ে অনেক বেশি

বগুড়ায় আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা সীমার চেয়ে অনেক বেশি

নাসিমা সুলতানা ছুটু : পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী গার্মেন্টস কর্মী আঙ্গুরী বেগম গত কয়েক মাস ধরে লক্ষ্য করছেন, কারো কথা তিনি ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। কানে সারাক্ষণ ঝিঁঝিঁ পোকার মতো এক অদ্ভুত ‘ভোঁ ভোঁ’ শব্দ লেগেই থাকে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী ট্রাফিক পুলিশ সামাদের (ছদ্মনাম) সারাদিন মাথা ঘোরে এবং কানেও তেমন একটা শুনতে পান না। অন্যদিকে, ২৫ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আরিয়ানের সমস্যা আরও ভিন্ন, ভিড়ের মধ্যে কেউ কথা বললে তিনি শব্দ শুনলেও বাক্য আলাদা করতে পারেন না।

আঙ্গুরী, সামাদ বা আরিয়ান কেউই জন্মগত বধির নন। কিন্তু প্রতিদিনের অনিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক কোলাহল আর অসতর্ক জীবনযাপন তাদের ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। এদের মতো অনেকেই উচ্চ মাত্রার শব্দ দূষণের কবলে পড়ে শ্রবণশক্তি হারাচ্ছেন আর দেশে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এই ঝুঁকি। আগে সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে কানে কম শোনার প্রবণতা দেখা গেলেও বর্তমানে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী কর্মজীবী মানুষ এবং ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণরা এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।

চিকিৎসকদের মতে, শহরে হাইড্রোলিক হর্নের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত হেডফোন ব্যবহার এবং কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা সামগ্রীর অভাবই এর প্রধান কারণ। তাই আমাদের অজান্তেই চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ‘নিঃশব্দ ঘাতক’, যার নাম শব্দ দূষণ।

বগুড়ার শব্দচিত্র : বগুড়া শহরে শব্দ দূষণের মাত্রা দিন দিন সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাটারিচালিত হাজার হাজার অটোরিকশার হাইড্রোলিক, অল্প বয়সী তরুণ ও কিশোরদের বেপোরোয়া বাইকের শব্দে অতিষ্ট নগরবাসী। এছাড়া দিনের বেলায় রয়েছে বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন যানের বিকট হর্ন। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বগুড়া শহরে শব্দ দূষণের চিত্রটি রীতিমতো ভয়াবহ।

আবাসিক এলাকাগুলোতে দিনের বেলা শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবল নির্ধারণ করা থাকলেও বাস্তবে তা ৭০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একইভাবে মিশ্র এলাকায় যেখানে সীমা ৬০ ডেসিবল, সেখানে শব্দ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ ডেসিবল। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে। সেখানে ৭০ ডেসিবল সাধারণ মাত্রা ধরা হলেও শব্দের তীব্রতা পৌঁছাচ্ছে প্রায় ১০০ ডেসিবলের কাছাকাছি।

শহরের প্রাণকেন্দ্র ও জনবহুল পয়েন্টগুলোতে শব্দের মাত্রা এখন জীবননাশী পর্যায়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিশিন্দারা এলাকায় দিনের বেলা সাধারণ মাত্রা ৫৫ ডেসিবল নির্ধারণ করা থাকলেও সেখানে ৬৫ ডেসিবল থাকে। নামাজগড় এলাকায় ৬০ ডেসিবেলের স্থানে শব্দমাত্রা হয় ৮০ ডেসিবল, তিনমাথা মোড়ে শব্দের তীব্রতা সর্বোচ্চ ৯৮ ডেসিবল, সাতমাথা এলাকায় ৯৫ ডেসিবল এবং চারমাথা মোড়ে ৯৪ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে।

এছাড়া দত্তবাড়ি, বনানী, মাটিডালি, কালিতলা এবং জলেশ্বরীতলার মতো এলাকাগুলোতেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। যত্রতত্র হর্ন বাজানোয় এসব পয়েন্টে সাধারণ মানুষের কানের সংবেদনশীল কোষগুলো তিল তিল করে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

বগুড়া শহরের শব্দ দূষণে বর্তমানে নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক সবখানেই ব্যাটারিচালিত প্রতিটি রিকশায় উচ্চমাত্রার হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া বাইকচালকদের কেউ কেউ শখের বসে তীব্র শব্দের হর্ন ব্যবহার করে জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল দুর্বিষহ করে তুলছেন। নিয়ম না মেনে যত্রতত্র হর্ন বাজানোই যেন এখন শহরের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে বগুড়ায় গত ১০ মাসে ১৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সূত্র জানিয়েছে, এসব অভিযানে ৬০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫শ’ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া রাস্তাঘাট থেকে নিষিদ্ধ ৫৭১টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জনসচেতনতা না বাড়লে কেবল আইনি প্রয়োগ দিয়ে এই সংকট মোকাবেলা কঠিন।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের ইএনটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. খোরশেদ আলম শব্দ দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, শ্রবণ সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশই সরাসরি শব্দ দূষণের শিকার। শিল্পাঞ্চলে কর্মরতদের মধ্যে এই হার ভয়াবহ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।

শব্দজনিত কানে কম শোনা সাধারণত ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী কর্মজীবী মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হেডফোনের অপব্যবহার নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘৬০-৬০’ নিয়ম না মানার কারণে তরুণরা দ্রুত স্থায়ী বধিরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে বগুড়ার বিশিষ্ট নাক-কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুজ্জামান বলেন, শব্দজনিত কারণে শ্রবণশক্তি হারানোদের অধিকাংশই শিল্প-কারখানায় কর্মরত, রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র ব্যসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং ট্রাফিক পুলিশে যারা কাজ করেন তারা।

এছাড়া কনসার্টে গিয়ে শ্রবণশক্তি হারানো রোগীও আমরা পাই। তিনি বলেন, কোনো মানুষ যদি প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবেল শব্দের মধ্যে থেকে কর্ম করে তবে অল্প বয়সেই তার শ্রবণশক্তি হারানোসহ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা মাথা ঘোরার মতো রোগ হতে পারে। এছাড়া তাদের ঘুমের সমস্যা ও মনোযোগেরও অভাব হতে পারে।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় বগুড়াস্থ অফিসের পরিচালক নিলুফা ইয়াসমিন এই সমস্যার মূল উৎপাটনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, শুধুমাত্র জরিমানা বা মামলা করে তেমন লাভ হয় না। মাঠ পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে আমরা হর্ন জব্দ করছি, কিন্তু সরবরাহ কমছে না। শব্দ দূষণ কমাতে হলে হাইড্রোলিক হর্ন উৎপাদন এবং এর সহজলভ্যতা বন্ধ করতে হবে। এজন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তবেই শব্দ দূষণের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে।

বুধবার ‘বিশ্ব শব্দ সচেতনতা দিবস’। দিবসটির প্রাক্কালে চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শব্দ দূষণজনিত বধিরতা বা এনআইএইচএল একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু একবার কানের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আগামী প্রজন্মকে একটি শ্রবণহীন ভবিষ্যতের হাত থেকে বাঁচাতে হলে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধকরণ এবং সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইসরাইল ইস্যুতে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব যুক্তরাষ্ট্রের

সরকার শিক্ষার্থীদের দেশের শত্রু হিসেবে গণ্য করছে: সোনিয়া গান্ধী

নড়াইলে ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা

সীমান্তে ৮ জনকে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, রুখে দিল বিজিবি

দেশে ফিরলেন স্পিকার

মধ্যরাতে ভিডিও বার্তায় আন্দোলনকারীদের যা বললেন মোদী