বগুড়ায় আশংকাজনক ভাবে প্রতিবছর কমছে কৃষি জমি
শাওন রহমান : উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার খ্যাত বগুড়ায় আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি, আর বিপরীতে বাড়ছে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বিভিন্ন অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, অবৈধ ইটভাটার বিস্তার, বাণিজ্যিক পুকুর খনন এবং শিল্পের প্রসারের কারণে প্রতি বছর কমছে তিন ফসলি উর্বর জমি। পাশাপাশি জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় যমুনা ও বাঙালির নদীর ভাঙনে প্রতি বছর শত শত হেক্টর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া জেলায় বর্তমানে মোট কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর। তবে প্রতি বছরই এর একটি বড় অংশ অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। জেলা কৃষি দপ্তরের বাৎসরিক কৃষি পরিসংখ্যান প্রতিবেদন অনুযায়ী, বগুড়ায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষিতে রূপান্তর হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে জেলায় মোট বিলুপ্ত হয়েছে ১ হাজার ১৫২ হেক্টর কৃষি জমি এবং গত ১০ বছরে অকৃষি খাতে চলে গেছে বা নষ্ট হয়েছে মোট ১ হাজার ৯৫২ হেক্টর আবাদি জমি। তথ্য বলছে, জেলায় থাকা প্রায় ২৪১টি ইটভাটার বড় অংশই আবাদি জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে সাবাড় করছে। এছাড়াও অতিলাভের আশায় অনেক কৃষক ধান বা সবজির জমি গভীর করে কেটে মাটি বিক্রির পাশাপাশি বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরে রূপান্তর করছেন। এমনকি শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের নামে নতুন নতুন কলকারখানা, সড়ক ও হাইওয়ে সম্প্রসারণের জন্য ফসলি জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে।
কৃষি জমি কমার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে জেলার অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন। ১৮৭৬ সালে বগুড়া পৌরসভার প্রতিষ্ঠাকালে এর আয়তন ছিল মাত্র ১ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার। পরে ১৯৮১ সালের ১ আগস্ট এটি ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয় এবং এর আয়তন দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার। ২০০৬ সালে বগুড়া পৌরসভার আয়তন বেড়ে ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটার হয়।
২০২২ সালের সরকারি জনশুমারি অনুযায়ী, বগুড়া পৌর এলাকার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮৬ হাজার। কিন্তু কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ব্যবসার কারণে আসা ভাসমান মানুষসহ বর্তমানে দিনে শহরের জনসংখ্যা ১০ লাখের বেশি অতিক্রম করে। ২০২২ সালের হিসাবমতে, কেবল পৌর এলাকায় পাকা/আধাপাকা হোল্ডিং নম্বর বা বসতবাড়ির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪১২টিতে।
আরও পড়ুনমৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এবং নগর পরিচালন সংক্রান্ত বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণায় স্যাটেলাইট ইমেজের তথ্য বলছে, গত ২০ বছরে বগুড়া শহরের মূল কেন্দ্র থেকে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কংক্রিট নির্মিত অবকাঠামো (ইট-সিমেন্টের বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন, রাস্তা-ঘাট) বেড়েঠে ৬০ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি বহুতল ভবনের পরিবর্তে কৃষি জমি কিনে একতলা বা দোতলা বাড়ি বানানোর এই ‘আনুভূমিক সম্প্রসারণ’ কার্যক্রমও বেড়েছে কয়েকগুণ। এমনকি ২০০১ সালেও শহরের চারপাশের যেসব এলাকায় তিন ফসলি জমি ও প্রাকৃতিক জলাশয় ছিল, তার একটি বড় অংশ বর্তমানে আবাসিক প্লট, বাইপাসসংলগ্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং অটো-রাইস মিল, কোল্ড স্টোরেজ ও শিল্পকারখানা রূপ নিয়েছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ণে মহাসড়ক ও বাইপাসসংলগ্ন এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় কমেছে আবাদি জমি।
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, কৃষি জমি কমে যাওয়ায় খাদ্যশস্যের জোগান ঠিক রাখতে অবশিষ্ট জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও সেচ দিতে হচ্ছে, যার ফলে মাটি তার স্বাভাবিক প্রাণশক্তি হারাচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে জমি হারিয়ে প্রান্তিক কৃষকেরা জীবিকার তাগিদে ভিড় করছেন শহরে। এমন পরিস্থিতিতে দুই বা তিন-ফসলি জমিতে আবাসন, ইটভাটা বা পুকুর খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে ‘কৃষি জমি সুরক্ষা আইন’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
পাশাপাশি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও কৃষি অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট জোন নির্ধারণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বগুড়ার কৃষি ঐতিহ্য রক্ষা করা কেবল স্থানীয় অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জড়িত। পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি আবাদি জমি রক্ষায় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে এখনই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
মন্তব্য করুন









