ভিডিও সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ২০ জুলাই, ২০২৬ ১০:০৯ পিএম

অবকাঠামো সংকটে কমে আসছে বগুড়ার রপ্তানি বাণিজ্য

অবকাঠামো সংকটে কমে আসছে বগুড়ার রপ্তানি বাণিজ্য

রাহাত রিটু : রপ্তানি সহায়ক অবকাঠামোর ঘাটতি, বৈশ্বিক মন্দা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প শহর বগুড়ার রপ্তানি বাণিজ্য চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে প্রতি বছর জেলার রপ্তানি আয় কমে আসছে।

এই সীমাবদ্ধতার ভেতরেও তাজা আলু ও পাটজাত পণ্যের মতো কিছু অপ্রচলিত খাত নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। তাই রপ্তানিযোগ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বগুড়ায় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো‘র অফিস পূণস্থাপান এবং বিভিন্নপন্যের গুনগতমান মান যাচাইয়ের জন্য স্থায়ী টেষ্টিং ল্যাব স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সঠিক সময়ে সরকারি মহাপরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন করা না গেলে সম্ভাবনাময় এই শিল্পাঞ্চলের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি স্থায়ীভাবে স্থবির হয়ে যেতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০২৪ সালে শুধুমাত্র ভারতেই রপ্তানি হয়েছিল ৫ কোটি ১৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৮০ ডলারের পণ্য। যার মধ্যে ছিল ফুড গ্রেড পাটের ব্যাগ, রাইস ব্রান তেল, ভার্টিক্যাল সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প ও স্পেয়ার পার্টস ইত্যাদি।

ওই বছরের জুলাই পর্যন্ত রপ্তানির ধারাবাহিকতা স্বাভাবিক থাকলেও আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তা কমতে শুরু করে। মূলত ভূরাজনৈতিক কারণে ভারত বগুড়া থেকে পণ্য আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, নেপালের সাথে যে আমদানি রপ্তানি ছিল ভারতের কারনে তা বন্ধহয়ে যায়।

পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে ভারতের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কায় আলু, কিছু পাটজাত পণ্য এবং জুতা প্রস্তুতের যন্ত্রপাতি রপ্তানি করা হয়। এ বছর ক্রুড রাইস ব্রান অয়েল, ফুড গ্রেড পাটজাত পণ্য, সেন্ট্রিফিউগাল ওয়াটার পাম্প এবং জুতা তৈরির মেশিন রপ্তানি করে মোট ৫ কোটি ৫৯ লাখ ১১ হাজার ১৪০ ডলার আয় হয়। তবে চলতি ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত রপ্তানি আয় আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।

বগুড়া চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ৬ মাসে বগুড়া থেকে রপ্তানি আয় এসেছে মাত্র ১ কোটি ৬২ লাখ ৮৬ হাজার ৯০০ ডলার। চলতি বছরও আলুসহ প্রথাগত কিছু পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশীয় সাধারণ রপ্তানি ব্যাপকভাবে সংকুচিত হলেও এলসি জটিলতা এবং বৈশ্বিক ডলার সংকটের মধ্যেও আটটি বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১.৬৩ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।

এটি নির্দেশ করে যে, সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে বগুড়ার উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার পূর্ণ সক্ষমতা রাখেন। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বগুড়ার পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত। এই সময়ে মূলত জুটব্যাগ, .রাইস ব্রান অয়েল, সুপারি, ওয়াটার পাম্প, চীনামাটির বাসন এবং সিরামিক সামগ্রী রপ্তানি হয়েছে। ’সবজির ভাণ্ডার’ খ্যাত বগুড়ার অর্থনীতিতে এবার নতুন ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আলু রপ্তানি।

আরও পড়ুন

তবে এই খাতের মন্দার পেছনে প্রধানতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে। করতোয়া ও যমুনা নদীবেষ্টিত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও গত দেড় দশকে কোনো কার্যকর নৌপথ গড়ে ওঠেনি। ফলে জুট বেল বা সিরামিকের মতো ভারী পণ্য পরিবহনে সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহ-সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী হিরু বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কার্গো হ্যান্ডেলিং সুবিধা, পচনশীল কৃষিপণ্য সরাসরি বিদেশে পাঠানোর জন্য এগ্রো-বেজড কার্গো সার্ভিস চালু, সারিয়াকান্দি-ধুনট নৌবন্দর ও এশিয়ান হাইওয়ের উন্নয়ন করা জরুরি। এছাড়া ভারতের সাথে নৌ ও সড়ক যোগাযোগ সহজ করে পরিবহন খরচ কমানো, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ ও ইপিজেড বাস্তবায়ন, বিসিক শিল্পনগরীর আধুনিকায়ন এবং তালোড়ায় বিশেষ কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তোলা হলে বগুড়ার রপ্তানি খাত আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

বগুড়া চেম্বারের সভাপতি এম. এস. এম. আতিকুর রহমান বাদল বলেন, একসময়ের ঐতিহ্যবাহী শিল্পনগরী বগুড়ার হারানো গৌরব ফিরে আনার জন্য বগুড়া চেম্বার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য সুধীজন ও ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হবে। কারণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রপ্তানি আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে দেশটিতে রপ্তানি কমে এসেছে।

তাই আমরা এখন মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখলের চেষ্টা করছি। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের কী ধরনের পণ্যের চাহিদা আছে, তা যাচাই করে নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি আগামী দিনে রপ্তানি আয় বাড়বে। বগুড়া চেম্বার সভাপতি উল্লেখ করেন, রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রদত্ত বিভিন্ন সেবা যেমন নিবন্ধন, শুল্ক সংক্রান্ত সনদ (জিএসপি, সিও, সাপ্টা ইত্যাদি) ইস্যু, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বগুড়ায় ইপিবির একটি শাখা কার্যালয় চালু থাকলেও ২০০৩ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বর্তমানে বগুড়াসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের রপ্তানিকারকদের সেবা নিতে ঢাকা বা রাজশাহীতে যেতে হয়। এতে সময় ও আর্থিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে; বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। তিনি অবিলম্বে বগুড়ায় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর শাখা কার্যালয়টি পুনঃস্থাপনের জোর দাবি জানান।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অবকাঠামো সংকটে কমে আসছে বগুড়ার রপ্তানি বাণিজ্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দায় ডুবে শিশু নিখোঁজ

পাবনায় আ’ লীগ ও ছাত্রলীগের ৩৭ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা

প্রকল্পের নামে জনগণের টাকা আত্মসাৎ করলে সরকার ছাড় পাবে না : সারজিস আলম

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে ৩০ ঘণ্টা পর বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার

প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত-সহজ করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর