ভিডিও শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:৪৮ দুপুর

হঠাৎ হামের প্রকোপ: সরকারের প্রস্তুতি ও প্রতিকার

বাংলাদেশে যখন সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে একের পর এক সাফল্য আসছে এবং আমরা জনস্বাস্থ্যের নানা সূচকে এগিয়ে যাচ্ছি, ঠিক তখনই নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে ‘হাম’ বা মিজেলস। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকায় হঠাৎ করেই হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় মনে করা হচ্ছিল নিয়মিত টিকাদানের (ঊচও) মাধ্যমে আমরা এই রোগটিকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। কিন্তু বর্তমান এই অনাকাক্সিক্ষত প্রাদুর্ভাব আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। 

হাম কেবল সাধারণ কোনো জ্বর বা শরীরে ওঠানো লালচে দানা (র‌্যাশ) নয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি বায়ুবাহিত রোগ। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা না নিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমনকি অবহেলায় শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই এই প্রকোপকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সরকারের প্রস্তুতি: 

গতিশীলতা ও সমন্বয় জরুরি : একটি জনবহুল দেশে যেকোনো সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব সামাল দিতে সরকারের ভূমিকাই মুখ্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের 

স্বাস্থ্য বিভাগকে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে: 

জরুরি টিকাদান ও ক্র্যাশ প্রোগ্রাম: যেসব এলাকায় হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে, সেখানে দ্রুততার সাথে বিশেষ টিকাদান অভিযান বা ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করতে হবে। বাদ পড়া একজন শিশুও যেন টিকার আওতার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। 

নজরদারি ও দ্রুত শনাক্তকরণ: প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সক্রিয় নজরদারি (ঝঁৎাবরষষধহপব) বাড়াতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আইসোলেশন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। 

যথেষ্ট ওষুধ ও জনবল সরবরাহ: গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ দিলে অন্ধত্ব ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

 প্রচারণা জোরদার করা: গণমাধ্যম, মাইকিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে টিকার গুরুত্ব ও হামের লক্ষণের ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

নাগরিকের দায়িত্ব: 

আরও পড়ুন

সচেতনতাই প্রধান অস্ত্র : সরকার শত চেষ্টা করলেও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো মহামারি বা প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সম্ভব নয়। এই সংকটে প্রতিটি পরিবারের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে ।

টিকাদানে অবহেলা নয়: ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে শিশুকে হামের দুই ডোজ টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো কারণে বাদ পড়ে থাকলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে দ্রুত টিকা দিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, টিকাই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়। 

লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ: শিশুর তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে দানাদার র‌্যাশ দেখা দিলে কবিরাজি বা অপচিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট না করে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। 

কুসংস্কার বর্জন: আমাদের সমাজে এখনো হাম হলে শিশুকে ঘরে আটকে রাখা, তেল-সাবান ব্যবহার না করা বা মায়ের দুধ না দেওয়ার মতো কুসংস্কার প্রচলিত আছে। এগুলো শিশুর ক্ষতি বাড়ায়। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে শিশুর পরিচ্ছন্নতা ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে। 

আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা: হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ। তাই আক্রান্ত শিশুকে অন্য সুস্থ শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের থেকে কিছুদিন আলাদা রাখাই শ্রেয়, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।

একটি সুস্থ ও সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। হঠাৎ করে হামের এই প্রকোপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রোগ প্রতিরোধের লড়াইয়ে শিথিলতার কোনো জায়গা নেই। সরকারের কার্যকর ও তড়িৎ পদক্ষেপের পাশাপাশি যদি প্রতিটি পরিবার সচেতন হয় এবং কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে বিজ্ঞানমনস্ক আচরণ করে, তবে এই প্রাদুর্ভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন কিছু নয়। আসুন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের শিশুদের জন্য একটি ঝুঁকিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। 

লেখক : 
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক

 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রতিশোধ নিতে আমরা বদ্ধপরিকর: মোজতবা খামেনি

হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়ে চীনা মুদ্রা নিচ্ছে ইরান

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু আজ

আজ ২৪ ঘণ্টা গ্যাস বন্ধ থাকবে যেসব এলাকায়

বিমানবন্দরে আটক উমরাহ ফেরত যাত্রী, ব্যাগে মিলল স্বর্ণ-ডলার

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পাস হল ৩১টি বিল