খাল খনন কর্মসূচি: টেকসই উন্নয়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় পানি ব্যবস্থাপনা একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। জলাবদ্ধতা, খরা, নদী-খাল ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দেশের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থা ক্রমেই বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে খাল খনন বা পুনঃখনন কর্মসূচি কেবল একটি অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত পরিবেশ ও উন্নয়ন নীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ভাবনা, রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব এবং বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এ কর্মসূচির গভীর সংযোগ রয়েছে।
বিএনপির ভিশন ২০৩০-এ একটি বিকেন্দ্রীকৃত, জবাবদিহিমূলক ও পরিবেশ-সংবেদনশীল উন্নয়ন কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। একইভাবে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফায় স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এসব নীতির আলোকে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলে তা শুধু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি করবে না, বরং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
তারেক রহমানের “We Have a Plan for the people and for the country” ধারণায়ও টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। খাল খনন কর্মসূচি এই তিনটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। একদিকে এটি কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ কমিয়ে একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে সহায়তা করে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ধারণা বর্তমানে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। খাল ও জলাশয়গুলো প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করে, যা বৃষ্টির পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খালগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় কার্যকর সহায়ক হতে পারে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs )-এর সঙ্গে খাল খনন কর্মসূচির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন (SDG 6), জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা (SDG 13) এবং স্থলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ (SDG 15)-এর ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পিত খাল খননের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে কৃষি, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গৃহীত খাল খনন কর্মসূচি ছিল দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অব্যবহৃত ও ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে সেচব্যবস্থা উন্নত করা, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সহায়তা করে। সামগ্রিকভাবে, শহীদ জিয়ার এই উদ্যোগটি দেশের টেকসই উন্নয়নের পথে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বাস্তবতা হলো, অতীতে অনেক খাল খনন প্রকল্প পরিকল্পনার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে কাক্সিক্ষত সুফল দিতে পারেনি। তাই এখন সময় এসেছে এই কর্মসূচিকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল হিসেবে বিবেচনা করার। এর জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সবশেষে বলা যায়, খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে, যদি তা সঠিক নীতি, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পারলে তা দেশের পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।
লেখকঃ
প্রফেসর ড. সামিউল তুষার
প্রক্টর, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি), সিলেট।
সেমিনার বিষয়ক সহ-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ইউট্যাব) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি।
সাধারণ সম্পাদক, ইউট্যাব সিকৃবি ইউনিট।
আজীবন সদস্য, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক






_medium_1774794160.jpg)

