জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে ভালো মানুষের সন্ধান করুন
মানুষের কল্যাণ এবং সার্বিক উন্নতিতে কাজ করার অভীপ্সায় স্বামী বিবেকানন্দ হাজার বার জন্মগ্রহণে রাজি। এর জন্য নরকে যেতেও তিনি প্রস্তুত। শত শত বুদ্ধের কারুণ্য-নিষিক্ত হৃদয়বান মানুষই ছিল তাঁর কাক্সিক্ষত। অজ্ঞ, কাতর, পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে, তাদের স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই তাঁর ধর্ম-দর্শন-আধ্যাত্মচিন্তার সবটাই জুড়ে আছে মানুষের কথা।
মানুষ শব্দটি ‘মনুষ্য’ শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে এসেছে। ইংরেজি Man, জার্মান Mann ও Mensch, আবেস্তান Manu ইত্যাদি সব শব্দ একই উৎসসম্ভূত। মানুষের নানা রূপ। মানুষ যখন অনুভূতিশীল তখন মানুষের বিপরীত শব্দ অমানুষ, মানুষ যখন মানব জাতি তখন বিপরীত শব্দ মনুষ্যেতর, মানুষ যখন পরিণত বা প্রাপ্তবয়স্ক তখন বিপরীত শব্দ ছেলেমানুষ। মানুষ শব্দের ক্রিয়াপদ ‘মানুষ করা’। মানুষ করা অর্থে- লালন পালন করা ও উপযুক্ত শিক্ষা দান করা। মানুষ শব্দের দ্বিতীয় ক্রিয়াপদ ‘মানুষ হওয়া’। মানুষ হওয়া মানে সত্য বলা, কারো ক্ষতি না করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, আপদে-বিপদে অন্যকে সাহায্য করা, সদাচরণ করা ইত্যাদি। সকলে যদি প্রকৃত মানুষ হতো তাহলে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানব জাতি এক শান্তির সমাজে বসবাস করতো।
ভালো মানুষ হতে হলে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সদিচ্ছা থাকাটা আবশ্যকীয়। এছাড়াও সত্য কথা বলা, পরোপকার করা, ক্ষমা করা, হিংসা-বিদ্বেষ-লোভ ত্যাগ করা, অন্যের হকসমূহ আদায় করা, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, খারাপ অভ্যাসসমূহ পরিত্যাগ করা, সাদামাঠা জীবনযাপন করা, ভালো কাজ করা, ইতিবাচক মনোভাব থাকা, নিজের ভুলের স্বীকৃতি দেয়াসহ মহান সৃষ্টিকর্তার আদেশাবলি মেনে চলা ও নিষেধাবলি পরিত্যাগ করার মাধ্যমে ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে।
আমরা সবাই মানুষ, যথার্থ মানুষ, ভাল মানুষ, সচেতন-শুভ্র-সুন্দর-বুদ্ধ-শুদ্ধসত্ত্ব-প্রমুক্ত মানুষ চান। জন্মালেই আমরা সবাই মানুষ হয়ে উঠি না। মানুষ হয়ে উঠতে হয়। চৈতন্যের সম্প্রসারণে মানুষের পশুত্ব থেকে দেবত্বে উত্তরণ। কী ভাবে? মানুষ অন্যান্য পশুর মতোই। এই পশুত্ব থেকে তার উত্তরণ ব্যক্তিত্বতে বুদ্ধি ও চিন্তার বিকাশে। যা অন্যান্য পশুর মধ্যে ঘটতে দেখা যায় না। পরবর্তী স্তর হল বুদ্ধিবৃত্তিকতা, অর্থাৎ মনন ও প্রজ্ঞায় উত্তরণ। তার পর আভিজাত্য- এই আভিজাত্য ধনসম্পদের দিক থেকে নয়, ভাবনার সমৃদ্ধিতে, চিন্তার ঐশ্বর্যে, উদ্দীপনার কৌলীন্যে। পরের স্তর মানবতা- মানবতার আলোকিত ভুবন। জীবনে জীবন সংযুক্তির প্রত্যয়। আমরা সবাই আত্মপরতায় বাঁচতে চাই। যেহেতু নিরন্ন মানুষের জন্য অন্ন, অসুস্থ প্রপীড়িতের জন্য ত্রাণ-সেবা, অনাথ-বিধবার অশ্রুমোচনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। তাই জনপ্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলগুলোর ভালো মানুষের সন্ধান করা অতীব জরুরি।
নিজের ভিটে-মাটি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পৈতৃক সম্পত্তি বলি দিয়ে কেন একজন বাংলাদেশি জনপ্রতিনিধি হতে চায় তার উত্তর এখন আর গবেষণার বিষয় নয়। এসব এখন নেংটা সত্য। বাংলাদেশের রাজ্নৈতিক ক্ষমতা মানে আকাশচুম্বি রিটার্নের নিরাপদ বিনিয়োগ। লটারির মত এ বিনিয়োগ একবার লাগানো গেলে অন্তত দশ প্রজন্মের আর্থিক নিশ্চয়তা দিয়েই কথিত জনপ্রতিনিধি ইহলোক ত্যাগ করতে পারেন। এই পরিবর্তন করতে পারবে-একমাত্র দেশের সাধারণ জনগণ। আসুন, আমরা ভালো মানুষকে খুঁজি, দেশের কল্যাণে তাঁকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করি।
একটি কথা রয়েছে-ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। কথাটির তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশে পুরাটাই বিপরীত। যাহা, দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের অশুদ্ধ চিন্তা চেতনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দলের পক্ষ থেকে একজন ভালো মানুষ, প্রকৃত জনগণের বন্ধু,মানুষের কল্যাণে কাজ করার ওয়াদাবদ্ধ নেতাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া উচিত। অর্থের বিনিময়ে নমিনেশন না দেয়া। এতে দলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। দলের ভিতরে কমে যাবে কোন্দল এবং কর্মীদের হতাশা। ত্যাগী ও প্রকৃত কর্মীরা দলের জন্য নিবেদিত হয়ে আজীবন নিঃস্বার্থভাবে কাজ করবে। দলগুলো জনগণের বিরুদ্ধে কোন কার্যক্রম গ্রহণ করবে না, পরিবেশবান্ধব ও কল্যাণকর কাজে সর্বদা নিয়োজিত থাকবে। দল হয়ে উঠবে জনগণের বিশ্বস্ত একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান। আর সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচিত হয়ে উঠবে পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষগুলোর একজন।
আরও পড়ুনএকটি সুন্দর সমাজ গঠনে একজন যোগ্য জনপ্রতিনিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দায়িত্বে অযোগ্য কেউ নিয়োজিত হলে সমাজে অশান্তি নেমে আসা স্বাভাবিক। হাদিস শরিফে অযোগ্যের ওপর দায়িত্ব ন্যাস্ত করাকে কিয়ামতের আলামত বলে অভিহিত করা হয়েছে। সাধারণত জনপ্রতিনিধি মানুষের অনেক সমস্যা সমাধান করতে হয়, বিরোধ মীমাংসা করতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে বিচারও করতে হয়। তাই একজন যোগ্য জনপ্রতিনিধি হতে হলে অবশ্যই সত্যকে অনুধাবন ও সুবিচার করার যোগ্যতা থাকতে হবে। যে সব সময় জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে, জনগণের সুখ-দুঃখে তাদের পাশে থাকবে, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করবে না। জনপ্রতিনিধিত্ব একটি আমানত। এর যথাযথ হক আদায়ের জন্য জনপ্রতিনিধির মধ্যে আমানত রক্ষার যোগ্যতা থাকতে হবে। তা না হলে এটিই তার জন্য লাঞ্ছনার কারণ হবে।
লেখক
মোঃ জিয়াউর রহমান
পরিবেশ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1792045615.jpg)
_medium_1791957492.jpg)
_medium_1791955052.jpg)
_medium_1791783094.jpg)
_medium_1791700498.jpg)
_medium_1791609890.jpg)


