জুলাইয়ের মধ্যেই কি সত্যিই দেউলিয়া হচ্ছে জাতিসংঘ?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, সদস্য দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া চাঁদা পরিশোধ না করায় বিশ্ব সংস্থাটি এখন আসন্ন আর্থিক ধসের মুখে। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই জাতিসংঘের তহবিল পুরোপুরি শূন্য হয়ে যেতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৩টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে গুতেরেস বলেন, নির্ধারিত বাধ্যতামূলক চাঁদা পরিশোধ না করলে জাতিসংঘের আর্থিক নিয়মকাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া বিকল্প থাকবে না। অন্যথায় এই সংকট ঠেকানো সম্ভব নয়।
চিঠিতে গুতেরেস লিখেছেন, আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আদায় না হওয়া অর্থ দিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করা যায় না, আর যে অর্থ কখনো পাওয়া যায়নি, তা ফেরত দেওয়াও সম্ভব নয়।
মহাসচিব জানান, অতীতেও জাতিসংঘ আর্থিক সংকটে পড়েছে, তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, এবার অনুমোদিত নিয়মিত বাজেটের একটি বড় অংশের অর্থ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবেই জানানো হয়েছে।
যদিও তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে এই সতর্কবার্তা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় দাতা যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত বাজেট ও শান্তিরক্ষা তহবিলে অর্থ দেওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি একাধিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে, যেগুলোকে তারা করদাতাদের অর্থের অপচয় বলে দাবি করছে।
আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী নির্ধারিত চাঁদা দেওয়া সদস্য দেশগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা। এই অর্থের ওপরই পুরো ব্যবস্থার অখণ্ডতা নির্ভর করে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বকেয়া অর্থের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা মোট প্রাপ্যের ৭৭ শতাংশের সমান।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে অব্যবহৃত অর্থ সদস্য দেশগুলোকে ফেরত দিতে হয়। ফলে এটি এখন একটি দুধারি তলোয়ারে পরিণত হয়েছে, কারণ যে অর্থ বাস্তবে পাওয়া যায়নি, সেটিই ফেরত দিতে বলা হচ্ছে।
আরও পড়ুনচিঠিতে মহাসচিব স্পষ্ট করে বলেন, হয় সব সদস্য রাষ্ট্র সময়মতো ও পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করবে, নয়তো আসন্ন আর্থিক ধস ঠেকাতে আর্থিক নিয়মকাঠামোয় মৌলিক সংস্কার আনতে হবে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় দাতা দেশ। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, সংস্থাটি তার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রচেষ্টায় যথেষ্ট সহায়তা দিচ্ছে না।
চলতি জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়, যার মধ্যে জাতিসংঘের ৩১টি সংস্থাও রয়েছে। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার উপেক্ষা করে বৈশ্বিক অ্যাজেন্ডা এগিয়ে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে মার্কিন করদাতাদের অর্থায়ন বন্ধ করা হয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মানবিক কর্মসূচির জন্য ২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও একই সঙ্গে সতর্ক করে জানায়, সংস্থাটিকে খাপ খাওয়াতে হবে, নইলে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। অথচ ২০২২ সালে এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার।
এর আগেও গুতেরেস একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন, বকেয়া চাঁদার কারণে জাতিসংঘ বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক আর্থিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত অক্টোবরে তিনি এই পরিস্থিতিকে আখ্যা দিয়েছিলেন দেউলিয়া হওয়ার দৌড় হিসেবে।
এদিকে গাজা পুনর্গঠন তদারকির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত বোর্ড অব পিস উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, এর মাধ্যমে জাতিসংঘের কিছু ভূমিকা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, এই উদ্যোগ জাতিসংঘের সঙ্গেই সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হবে।
মন্তব্য করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক







