ভিডিও বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৪:৫৮ দুপুর

স্কুল ব্যাংকিং শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের প্রেরণা

হাতে জমানো টাকা যে কোন প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে খরচ হয়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটানোর ভাবনা থেকেই আসে টাকা জমানো বা সঞ্চয়ের ধারণা। আমাদের দেশের সঞ্চয়ী মনোভাবের মানুষ যুগ যুগ ধরে অতিরিক্ত খরচ থেকে বাঁচানো টাকা মাটির ব্যাংকে, বালিশ তোষকের নিচে বা বাঁশের খুঁটিতে সংরক্ষণ করেছে। বিশেষ করে  মাটির তৈরি ব্যাংক টাকা পয়সা জমানোর ঐতিহ্যবাহী একটি মাধ্যম। মাটির ব্যাংকে টাকা জমানোর প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থেকেছে আমাদের শিশু-কিশোররাও। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ার পর এবং আরো পরে প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং সুবিধা বিস্তৃত হওয়ার কারণে মাটির ব্যাংকের মতো অনিরাপদ স্থানে টাকা জমানো এখন অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। ১১ থেকে ১৭ বছরের শিশু কিশোররা মা বাবা, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্ন উৎসব পার্বণে বা কোন বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে উপহার হিসেবে যে নগদ অর্থ পেয়ে থাকে কিংবা  নিয়মিতভাবে দুপুরের টিফিন বাবদ যে অর্থ বাবা মা’রা সন্তানের হাতে তুলে দেন, তা প্রয়োজনের বেশি খরচ না করে কিছু অর্থ বাঁচিয়ে নিরাপদ আর্থিক  প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংকে জমানোকে উৎসাহিত করতে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ নামে ফলপ্রসূ একটি পদ্ধতি চালু হয়েছে। স্কুল ব্যাংকিং হলো ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা একটি আধুনিক, ডিজিটাল ও আনুষ্ঠানিক  ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা স্কুল থেকেই অ্যাকাউন্ট বা হিসাব খোলা, অনলাইনে লেনদেন ও আর্থিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেয়। এ ব্যবস্থা তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ও ভবিষ্যৎ আর্থিক জীবনের ভিত্তিও স্থাপন করে। স্কুলের নিকটস্থ ব্যাংক শাখায় একটি সেভিংস হিসাব খোলার উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করাই স্কুল ব্যাংকিং এর উদ্দেশ্য। ২০১০ সালের আগে শুধু ১৮ বছরের বেশি বয়সীরাই ব্যাংকে হিসাব খুলতে পারতেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় টেকসই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য নিয়ে ১৮ বছরের কম বয়সী স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য হিসাব খোলার সুযোগ চালু করা হয়। শিক্ষার্থী আইডি কার্ড দেখিয়ে মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়ে যে কোন হিসাব খোলার সুযোগ পায়, যা সাধারণত চার্জমুক্ত। হিসাব খোলার ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতির প্রয়োজন হয়, কারণ দেশের আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক। বর্তমানে সবগুলো তফসিলি ব্যাংকে এই স্কুল ব্যাংকিং চালু রয়েছে। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। স্কুল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঞ্চয় করার মনোভাব ও অভ্যাস গড়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। স্কুল ব্যাংকিং এর সুবিধা হলো-এখানে খোলা হিসাবে বৃত্তি উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করা যাবে,জমানো টাকা নিরাপদ থাকবে, এটিএম কার্ডের মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে সহজে টাকা তোলা যাবে, ঝামেলাহীনভাবে স্কুলের বেতন/ফি পরিশোধ করা যাবে, শিক্ষা বীমা সুবিধা গ্রহণ করা যাবে, প্রয়োজনে ঋণ সুবিধাও গ্রহণ করা যাবে। 

স্কুল ব্যাংকিং অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচলিত রয়েছে। এর মাধ্যমে কোমলমতি ছাত্র ছাত্রিরা ছেলেবেলা থেকেই ব্যাংক হিসাব খোলার নিয়মকানুন, হিসাব পরিচালনায় দক্ষতা গড়ে তুলতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালের পর মোট ২৬ হাজার ৪৫৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। মোট হিসাব খোলা হয়েছে ৪৮ লাখের বেশি।  মোট হিসোবের ৫২ দশমিক ৭৪ শতাংশ গ্রামে, ৪৭ দশমিক ২৬ শতাংশ শহরে। হিসাবের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপাত প্রায় সমান। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব হিসাবে মোট জমার পরিমাণ ২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিংকে আরো জনপ্রিয় করতে সব ব্যাংকের শাখাকে নিকটবর্তী অন্তত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্কুল ব্যাংকিং সেবা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিক্ষার্থীদের জমার উপর সর্বোচ্চ সুদ দেওয়ারও ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা একটি সূত্রে জানান, আর্থিক শিক্ষার ঘাটতির কারণে দেশের অনেক মানুষ এ ধরনের আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় আসতে চান না। দেশের ১১ হাজারের বেশি ব্যাংক শাখার মধ্যে অন্তত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে স্কুল ব্যাংকিং পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাংকিংয়ে উৎসাহিত করতে এখন সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। দেশে মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী। তার মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীই ৪ কোটির বেশি। তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাইরে রাখা উচিত হবে না। ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে ইয়াং স্টার, ফিউচার স্টার, প্রজন্ম স্টার ইত্যাদি আকর্ষণীয় নামে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য যেসব সঞ্চয় স্কিম চালুু করেছে, তাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আকৃষ্ট হচ্ছে বলে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে। এটি বেশ আশাব্যঞ্জক। দেশে সঞ্চয়ের বিপরীতে সুদ বা মুনাফার হার অনেক কম। শিক্ষ্থর্াীদের অর্থ জমার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হলে সুদ বা মুনাফার হার আরো বাড়াতে হবে। বড়দের সঞ্চয় বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি স্কুল ব্যাংকিং এর মতো একটি যুগান্তকারি ব্যাংক ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদেরও সঞ্চয় বাড়ানো গেলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখবে বলে ওয়াকিবহালমহলের অভিমত।  

লেখকঃ

আরও পড়ুন

রাহমান ওয়াহিদ

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হাজতখানায় দুই আওয়ামী লীগ নেতার ভূরিভোজের আয়োজন

স্কুল ব্যাংকিং শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের প্রেরণা

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী-বিনাশের ইতিহাস

আগামী নির্বাচন নতুন বন্দোবস্তের নির্বাচন: ফয়জুল করীম

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন হচ্ছে সর্বনিম্ন ২০,০০০ টাকা, সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা

বিপিএলে যে রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে শরিফুল