নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা : এমপি পুত্র মিন্টু ৩ দিনের রিমান্ডে
নাটোর প্রতিনিধি : নাটোরের গুরুদাসপুরে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোঃ শাকিল ইসলাম (২৩) মারা গেছেন। গত সোমবার দিনগত রাত সাড়ে আটটার সময় ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের বিএনপি দলীয় এমপি মোঃ আব্দুল আজিজের ছেলে ও যুবদল নেতা নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা নুরুজ্জামান মিন্টুকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ আমির হোসেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
এসময় আদালতের বিচারক মোঃ মেহেদী হাসান তার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এর আগে গত সোমবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে গুরুদাসপুরের ধারাবারিষা এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করে হেফাজতে নেয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে বিচারক শুনানি শেষে তিনদিনের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মোঃ নজরুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। গ্রেফতার নুরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে শাকিলের প্রথম নামাজে জানাজা গতকাল মঙ্গলবার বেলা ২টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত হয়।
পরে রাত ৮টায় নাটোরের গুরুদাসপুর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। সন্ত্রাসী হামলায় শাকিল নিহত হলে এলাকায় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।
এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শাকিল গুরুদাসপুর পৌর সদরের চাঁচকৈড় কাচারিপাড়া মহল্লার রাজমিস্ত্রি রবিউল করিমের ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাতে হেলমেট পরা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি চাঁচকৈড় বাজারপাড়া সড়কে পৌর বিএনপির আহ্বায়ক দুলাল সরকারের বাড়ির কাছে শাকিলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
এ সময় তারা দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। পরে শাকিল পালানোর চেষ্টা করলে শহিদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে গুরুতর জখম করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে ওই রাতেই চিকিৎসকেরা তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় বিক্ষোভ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের উদ্যোগে সোমবার রাতেই স্থানীয় চাঁচকৈড় বাজারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বাজার প্রদক্ষিণ শেষে সমাবেশে মিলিত হয়।
আরও পড়ুনসমাবেশে বক্তব্য দেন উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মাসুদ রানা, সদস্য সচিব রবিউল করিম, পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক শাকিল আহমেদসহ অন্য নেতারা। বক্তারা কালোব্যাজ ধারণ করে তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে হত্যাকান্ডে জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
মৃত্যুর আগে গত ২০ এপ্রিল নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কা প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন শাকিল ইসলাম। তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে দাবি করে গুরুদাসপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। ওই জিডিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ রয়েছে বলেও পোস্টে দাবি করেন শাকিল।
তবে তার করা উল্লেখিত জিডির অস্তিত্ব ও বিষয়বস্তু এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ এখনো জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। এদিকে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার ১২ দিন পর তার মৃত্যু হয়। তার আগে গত ১৯ অক্টোবর হামলার ঘটনায় মামলা হলেও গ্রেফতার ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে পরিবার, দলীয় নেতকর্মীসহ স্থানীয়রা।
গত ২০ এপ্রিল নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে শাকিল লেখেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে, যারা আমাকে মারতে পারবে তাদেরকে নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে।
পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, এ বিষয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটি জিডি করেছেন এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ রয়েছে। তার কিছু হয়ে গেলে ওই জিডি অনুযায়ী মামলা করার আহ্বানও জানান তিনি। এছাড়াা ক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতা কর্মীরা গুরুদাসপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে ঘটনার জন্য মিন্টুকে দায়ী করেন। নিহত শাকিলের পিতা রবিউল করিম বলেন, ‘আমার ছেলের ওপর হামলার ঘটনায় নেতাদের কোনো ভূমিকাই দেখিনি। হামলার ১৪ দিনেও কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি।
আমি ছেলে হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই। শাকিলের মৃত্যুতে গুরুদাসপুর এখন শোকাচ্ছন্ন। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ।এসময় তিনি বলেন- ‘হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি অবলোকন করেছি।
শাকিলের চিকিৎসার যত খরচাদি লাগে দিয়েছি। কিন্তু সে মারা যাবে- এ ধারণা ছিল না।’ তিনি আরও বলেন- ‘ওসিকে মূল রহস্য উদঘাটন করতে বলেছি। অপরাধী আমার সন্তান হোক আর যেই হোক না কেন, যদি প্রকৃত স্বাক্ষ্যপ্রমাণে দোষী হয় তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।’
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল করিম থানায় মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করা হবে।
মন্তব্য করুন







