আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফের শক্তিশালী হচ্ছে
স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা অফিস : আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস । জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলোয় গণতন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি এবং গণতন্ত্র চর্চাকে উৎসাহিত করার প্রয়াসে দিবসটি পালিত হয়। ২০০৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এই দিবসের ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ। এরপর থেকেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উদ্যোগে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এদিকে, দেশের গণতন্ত্র গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুনরায় বিকশিত হওয়া গণতন্ত্র এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সুশাসন ও আইনের শাসনের পথে এগিয়ে চলছে। বছরের পর বছর গণতন্ত্র থেকে বঞ্চিত থাকার পর বাংলাদেশের জনগণ এখন গণতন্ত্রের প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করতে পারছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পথচলার ইতিহাস সহজ ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরাচারী 'শাসনের অবসান ঘটে। তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় ধরে দমন-পীড়নও রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী ছিল এই দেশ। শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক শাসনামলে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল; তলানিতে ঠেকেছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জনআস্থা। নির্বাচনগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল। বিরোধী রাজনীতি ছিল প্রচন্ড চাপের মুখে। তার ওপর গণমাধ্যমের ওপর ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ব্যবহৃত হচ্ছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের চরম অবনতির কথা নথিভুক্ত করেছে।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত। ফলশ্রুতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে। ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টিতেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের নির্বাচন 'মধ্যরাতের নির্বাচন' হিসেবে পরিচিতি পায়। আর ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনকে বলা হয় 'ডামি নির্বাচন'। হাসিনার আমলে বিরোধীদলগুলো- বিশেষ করে বিএনপি গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা, সভা-সমাবেশে বাধা ও রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, প্রায় দেড় লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৬০ লাখের কাছাকাছি মামলা দায়ের করা হয়। রাজনৈতিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে অনেক বিরোধী নেতাকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদন্ড ও মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক নেতারা নন, সাংবাদিক এমনকি গণমাধ্যমের সম্পাদক কিংবা সাধারণ নাগরিকরাও সরকারের সমালোচনা করায় আইনি চাপের মুখে পড়েন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ ছিল বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার নিষ্ঠুর এক হাতিয়ার।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ৫২০ জনকে এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত করা হয় এবং অন্তত ৯৭জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের গুমের ঘটনা ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়াবহ রূপের একটি প্রতীক। করোনা মহামারীকালে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও লেখক মুশতাক আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে মুশতাক আহমেদ কারাবন্দী অবস্থায় মারা যান। অনলাইন টক শোতে নিজের মতপ্রকাশের কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী খাদিজাতুল কুবরাকে এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দী থাকতে হয়।ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপরও অব্যাহত চাপ ছিল। আমার দেশ, দৈনিক দিনকাল, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও চ্যানেল ১-এর মতো বেশ কিছু গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। সরকারি তদন্ত কমিশন ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের অভিযোগ পেয়েছে, যার মধ্যে ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ জনের। 'আয়নাঘর' ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আতঙ্কের নাম। এই দীর্ঘ নির্যাতন-নিপীড়নে তৈরি হওয়া জনরোষের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলন অচিরেই জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোতের বিস্ফোরণে রূপ নেয়। সরকার শক্তি প্রয়োগ করলে এটি মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, জুলাই বিপ্লবে সহিংসতায় কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন।
আরও পড়ুনচবিবশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান।কোটি কোটি বাংলাদেশির জন্য দিনটি ছিল একদিকে স্বৈরাচারের পতন এবং নতুন বাংলাদেশের সূচনার। তবে হাসিনার স্বৈরাচার সরকার অপসারণই শেষ কথা ছিল না। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুনরুদ্ধার এবং ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই পথ তৈরি করে দেয়। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। ১৭ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ হগ্রহণ করেন।
নতুন সরকারের প্রাথমিক কর্মসূচিগুলোই গণতান্ত্রিক নবযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারেক রহমানের আচরণে সরলতা, সংযম ও সেবার মানসিকতা ফুটে উঠেছে। তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ভোগের বিষয় হিসেবে নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। প্রতিশোধমুক্ত রাজনীতির চর্চার ওপর তাঁর গুরুত্ব আরোপ দেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে এমন একটি রাষ্ট্র গড়ার কথা বলেছেন, যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার পাবে।
গণতন্ত্র কেবল ভোটপ্রাপ্তির সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ভোটের পর সরকার কীভাবে আচরণ করে, তার ওপরও গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয়। সমালোচকদের সরকার কীভাবে দেখে, এটির মধ্যেই সরকারে গণতান্ত্রিক চরিত্রের প্রমাণ মেলে। অবশ্যই বিরোধীদলকে কথা বলার, সাংবাদিকদের অনুসন্ধান করার এবং নাগরিকদের সমালোচনা করার অধিকার সরকারকে দিতে হবে। ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়, আর সমালোচনা কোনো অপরাধও নয়। নতুন বাংলাদেশে এই ধারণাগুলো এখন দৃশ্যমান। সংসদেও বিরোধী কন্ঠস্বর সোচ্চার রয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো সভা-সমাবেশ করছে। গণমাধ্যম আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন। জনগণও এখন প্রকাশ্যে সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের এই পরিবর্তন আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু প্রায় দীর্ঘ দেড় যুগের তয় আর উৎকণ্ঠার পর এসব পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক গুরুত্ব অপরিসীম। ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকার গণতান্ত্রিকশাসনব্যবস্থা ও জনআস্থা পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। এই সময়ে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের কোনো ঘটনা ঘটেনি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গণমামলা নেই, নেই গণমাধ্যম বন্ধের কোনো নজিরও। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের অধিকার এখন জনপরিসরের অংশ।
দেশ এখন রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতি থেকে গণতান্ত্রিক আশার আলোয় ফিরছে। তবে যাত্রা এখনও শেষ হয়নি, সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে লক্ষ্য স্পষ্ট, তাই নির্বাচন এখন অর্থবহ। বিরোধী রাজনীতির দাবি-দাওয়া জানানোর অধিকার ফিরে এসেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার বদল হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে। আর দায়িত্ব নেওয়া নতুন নেতৃত্ব সরলতা, সহনশীলতা ও সংযমকে শাসনের গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তাই আজকের বাংলাদেশের গল্প কেবল একটি সরকারের পতন বা অন্য কারও উত্থানের গল্প নয়। এটি একটি জাতির তার গণতান্ত্রিক সত্তাকে নতুন করে গড়ার গল্পও।দীর্ঘ গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের পর বাংলাদেশ এখন ফের সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে কেবল গণতন্ত্রই ফেরেনি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তিশালী ভিত্তিও স্থাপিত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন

_original_1789018053_medium_1789446627.jpg)
_medium_1789367458.jpg)



