দীর্ঘদিন বন্ধ সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুটমিল সরকারের বাৎসরিক ব্যয় ৮ কোটি টাকা
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি: উৎপাদন নেই, তবুও থেমে নেই ব্যয়। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে সরকারের প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা। বছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৮ কোটিরও বেশি। উৎপাদন না থাকায় কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরছে, আর কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন হাজারো শ্রমিক।
জানা যায়, ১৯৬০ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুর এলাকায় প্রায় ৭৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নর্দান পিপলস জুট মিল। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কওমি জুট মিল, পরে যা জাতীয় জুট মিল নামে পরিচিতি পায়।
একসময় প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ টন পাট সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরণের পাটজাত পণ্য উৎপাদন করা হতো। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি করা হতো। আর এ মিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান।
দীর্ঘদিন লাভজনকভাবে চললেও দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক সংকটে ২০০৭ সালে প্রথমবার এর উৎপাদন বন্ধ হয়। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে পুনরায় চালু হলেও পরে ২০২০ সালের ১ জুন আবারও উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ ২০ বছরের জন্য মিল লিজ নিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বোনাস বকেয়া রেখেই ২০২৪ সালে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
সাবেক শ্রমিক রতন আলী বলেন, মিল চালু থাকাকালে প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করতেন। বর্তমানে সামান্য কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চালান। আরেক শ্রমিক বেলাল হোসেন বলেন, জুট মিলই ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। মিল বন্ধ হওয়ার পর বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করে কষ্টে দিন কাটছে। মিল পুনরায় চালু হলে পুরোনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আরও পড়ুনসিরাজগঞ্জ জেলা শ্রমিক দলের(ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি বিশা শেখ বলেন, জাতীয় জুট মিল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি জেলার অর্থনীতি, পাটচাষি ও হাজারো শ্রমিকের জীবিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মিলটি চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।
জাতীয় জুট মিলের মজদুর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে মিলটি পুনরায় চালু করা। এতে শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় অর্থনীতি সবাই উপকৃত হবে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বাচ্ছু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিলটি বন্ধ থাকায় শুধু হাজারো শ্রমিকই কর্মহীন হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ। বর্তমান সময়ে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে। সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জাতীয় জুট মিল পুনরায় চালু করা।
জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন জানান, মিলটি বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে রয়েছে। বর্তমানে ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। উপযুক্ত বিনিয়োগকারী পাওয়া গেলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। এছাড়া দেশের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পুনরায় চালুর বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মন্তব্য করুন







