জমিতে অতিরিক্ত সার ব্যবহারে কমছে ফসলের উৎপাদন, সচেতনতা তৈরি করেও কাজ হচ্ছে না
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়া সদর এলাকার কালশিমাটি গ্রামের কৃষক হারুনুর রশিদ রঞ্জু। গেল ইরি-বোরো মৌসুমে তার ৫৫ শতক জমিতে ধান চাষের জন্য সার ব্যবহার করেছেন ৬০ থেকে ৭০ কেজি। তিন দফায় ব্যবহৃত এই সারের মধ্যে রয়েছে-ইউরিয়া, ফসফেট, পটাশ (এমওপি) ও জিপসাম।
ধান চাষাবাদে জমিতে সার প্রয়োগের পরিমাণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই কৃষক বলেন, বাপ-দাদার সময় থেকে যে পদ্ধতিতে জমিতে সার দেওয়া হচ্ছে, সেই পদ্ধতিতেই তারা ব্যবহার করছেন। আবার সার বিক্রেতা বা ডিলারের পরামর্শ এবং চাষাবাদের অভিজ্ঞতা থেকেও তারা জমিতে সার প্রয়োগ করেন। তবে আগের চেয়ে জমিতে এই প্রয়োগের পরিমাণ বেড়েছে বলে জানান এই কৃষক।
শ্যামবাড়িয়া এলাকার কৃষক এরশাদ মিয়া বলেন, এক বিঘা জমিতে ইরি-বোরো ধান চাষের জন্য কয়েক দফায়-প্রথমে মাটিতে, পরে ধান গাছ হওয়ার পর আরও দুই থেকে তিনবার সার প্রয়োগ করতে হয়। সবমিলে ৩৫ থেকে ৪০ কেজি-ইউরিয়া, ফসফেট, পটাশ সার প্রয়োগ করতে হয়েছে। এই কৃষক জানান, ফসল উৎপাদনের জন্য তিনি নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন। ফসলভেদে কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, তা নিজেরাই নির্ধারণ করেন।
শাজাহানপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর এলাকার কৃষক আব্দুল গফুরসহ অনেকেই জানান, বেশি সার না দিলে এখন আর ফলন ভালো হয় না। তাই প্রতিবছরই সারের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে। তবে মাটির গুণগত মান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় তাদের মতো বেশিরভাগ কৃষকই অনুমাননির্ভর সার ব্যবহার করছেন।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে, গেল ইরি-বোরো মৌসুমে প্রতি একর জমিতে সুষম সার প্রয়োগের হিসেবে-১০৫ কেজি ইউরিয়ার, ৩০ কেজি টিএসপি, ১৫ কেজি ডিএপি, ৬০ কেজি এমওপি, ৪৫ কেজি জিপসাম, ৩ কেজি দস্তা এবং ২ হাজার কেজি জৈব সার ব্যবহার (খরচ) দেখানো হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রচলিত ধ্যান-ধারনা, মাটি ও জমির গুণাগুণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা না থাকা এবং পাশের কৃষকের প্রয়োগের পরিমাণ দেখে কৃষকরা তাদের জমিতে সার প্রয়োগ করছেন।
জানতে চাইলে সদর উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম বলেন, জমিতে সার প্রয়োগের ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ে কৃষককে পরামর্শ দিলেও তারা তা মানতে চান না। পার্শ্ববর্তী কৃষকের পরিমাণ দেখে বেশিরভাগ কৃষক জমিতে সার প্রয়োগ করেন।
অথচ না বুঝে রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে, কমছে উৎপাদনশীলতা। তিনি আরও বলেন, সার প্রয়োগের ব্যাপারে কৃষকদের সচেতন করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত সার প্রয়োগের ক্ষতিকর দিক নিয়ে কৃষকদের সচেতন করার পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারেও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুনএদিকে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের সমন্বয় অসম মাত্রায় ব্যবহার করেন, যা মাটির স্বাস্থ্য, ফসলের উৎপাদনশীলতা ও কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ১৫ জুন প্রকাশিত ‘রিপারপোজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশস এগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুষম অনুপাতে সার প্রয়োগ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষক অতিরিক্ত ফসফরাস ব্যবহার করেন, প্রতি ১০ জনের প্রায় ৯ জন প্রয়োজনের তুলনায় কম সালফার প্রয়োগ করেন এবং ১০ জনের ৬জন পটাশিয়ামের ঘাটতি রেখে সার ব্যবহার করেন। নাইট্রোজেন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ধান চাষিরা প্রয়োজনের তুলনায় কম নাইট্রোজেন ব্যবহার করেন, আর পেঁয়াজ ও সবজি চাষে এর অতিরিক্ত ব্যবহার দেখা যায়।
অঞ্চলভেদে সার ব্যবহারের ভারসাম্যহীনতায়ও বড় পার্থক্য রয়েছে। বরিশাল ও সিলেটে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার প্রয়োগের প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে, খুলনা ও রাজশাহীতে অতিরিক্ত প্রয়োগের প্রবণতা বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই ভারসাম্যহীনতা দূর করা গেলে বোরো ধানের উৎপাদন ৩৩ শতাংশ, আমন ধানের উৎপাদন ৬৫ শতাংশ এবং আলুর উৎপাদন ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জানতে চাইলে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট বগুড়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ আহসান রেজা চৌধুরী বলেন, বগুড়ার কৃষকরাও পুরাতন ধ্যান-ধারণা থেকে জমিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করে আসছেন। এতে করে মাটির পিএইচ কমে যাচ্ছে, ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি কমার পাশাপাশি ফসল মাটি থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যউপাদান গ্রহণ করতে পারছে না।
কৃষকদের এ ব্যাপারে পরামর্শ দিলেও তারা ঝুঁকি মনে করে তা গ্রহণ করতে চান না। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জমিতে পরিমিত বা সুষম সার প্রয়োগে কৃষকদের সচেতন করতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে তাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ফসলের মৌসুমে মাঠ দিবস কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়াও ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে কাজ করতে বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণের কাজ চলছে।
মন্তব্য করুন








