সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইমন হত্যা, ৯ দিন পর উন্মোচিত রহস্য
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসে নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাহরুয়ার আহমেদ ইমন (২২) হত্যাকাণ্ডের রহস্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে দেশটির পুলিশ।
বাসে মোবাইল ওয়াই-ফাই হটস্পট শেয়ার করা এবং এ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে নির্জন স্থানে নিয়ে ইমনকে প্রথমে ছুরিকাঘাত ও পরে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ মাটিচাপা দিয়ে অপহরণের নাটক সাজিয়ে নিহতের গ্রিসপ্রবাসী বাবার কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণও দাবি করে অভিযুক্ত।
এ ঘটনায় লারনাকা জেলা আদালত গ্রেপ্তারকৃত ২২ বছর বয়সি আসামি বাংলাদেশি যুবক শাহিন বাবুর ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে এ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে বলে জানিয়েছে সাইপ্রাসের স্থানীয় গণমাধ্যম।
পুলিশি জবানবন্দিতে ঘাতক শাহিন বাবু জানায়, সে তুর্কি সাইপ্রাস থেকে অবৈধভাবে গ্রিক সাইপ্রাসে প্রবেশ করে বসবাস করছিল। গত ৭ জুন একটি বাসে ভ্রমণের সময় ইমনের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়। ওই সময় ইমন তার কাছে কাজ খুঁজে দেওয়ার অনুরোধ জানান এবং তারা একে অপরের মোবাইল নম্বর বিনিময় করেন।
শাহিন বাবুর দাবি, বাসে থাকা অবস্থায় সে ইমনের কাছে মোবাইলের ওয়াই-ফাই হটস্পট শেয়ার করতে বললে ইমন তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে অপমান করেন। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ইমনকে হত্যার পরিকল্পনা সাজায় শাহিন।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, বাসের সেই অপমানের ‘প্রতিশোধ’ নিতে ৯ জুন একটি সুপারমার্কেট থেকে ছুরি কেনে শাহিন। তারপর ১১ জুন সে ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিদিন ৫০ ইউরো মজুরিতে একটি কারখানায় খণ্ডকালীন কাজের প্রলোভন দেখায়।
এতে বিশ্বাস করে ইমন ১২ জুন ওরেক্লিনি এলাকার বাসা থেকে বাসে চড়ে কোফিনু এলাকায় শাহিনের সঙ্গে দেখা করতে যান। ইমনকে কোফিনু কসাইখানার দিকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায় শাহিন।
সেখানে অন্ধকার রাস্তায় শাহিন তার কাছে থাকা ছুরি দিয়ে ইমনকে আঘাত করে। তারপর মৃত্যু নিশ্চিত করে গর্ত খুঁড়ে লাশ মাটিচাপা দিয়ে পালিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার পর ঘাতক শাহিন নিহত ইমনের মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং অপহরণের নাটক সাজিয়ে অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করে। ইমনের ফোন থেকে তার গ্রিসপ্রবাসী বাবা নাসির উদ্দিনের মোবাইলে বাংলায় বার্তা পাঠানো হয়।
আরও পড়ুনআদালতের রিমান্ড আদেশে বলা হয়েছে, ঘটনার রাতে ইমনের বাবার ফোনে প্রথম বার্তা আসে। তারপর পরবর্তী বার্তাগুলোতে রোববারের মধ্যে ৩৫ হাজার ইউরো (প্রায় ৪৫ লাখ টাকা) মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় অভিযুক্ত। আতঙ্কিত বাবা ছেলের সঙ্গে কথা বলতে বা দেখতে চাইলে ফোনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এদিকে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে ইমনের বাবা সাইপ্রাস ও গ্রিস কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন। তদন্তে নেমে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ইমনের মোবাইল ফোনের সর্বশেষ সিগন্যাল কোফিনু এলাকায় শনাক্ত করে। এরপর স্থানীয় সিসিটিভি ফুটেজ এবং বাসের রুট ধরে তল্লাশি চালিয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে শাহিন বাবুকে গ্রেপ্তার করে লারনাকা জেলা পুলিশ ও সিআইডি।
গ্রেপ্তারের সময় শাহিনের কাছে দুটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়, যার একটি ছিল নিহত ইমনের। এছাড়া শাহিনের ফোনে ইমনের ব্যবহৃত সিম কার্ডটি সচল ছিল।
গ্রেপ্তারের পর শাহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কোফিনু এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে রোববার ইমনের পচনধরা লাশ উদ্ধার করে ফরেনসিক বিভাগ। একইসঙ্গে হত্যায় ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরি এবং ইমনের ব্যক্তিগত সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়।
আদালতে অভিযুক্ত শাহিন বাবুর বিরুদ্ধে ‘পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, ক্ষতির উদ্দেশ্যে অপহরণ, চাঁদাবাজি, হুমকি দিয়ে সম্পত্তি দাবি এবং সাইপ্রাসে অবৈধভাবে অবস্থানের’ মতো একাধিক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিহত শাহরুয়ার আহমেদ ইমন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির উদ্দিনের বড় ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মাত্র চার মাস আগে স্টুডেন্ট ভিসায় উচ্চশিক্ষার জন্য সাইপ্রাসে গিয়েছিলেন ইমন। পড়াশোনার পাশাপাশি লারনাকা জেলার ওরোক্লিনি এলাকায় থেকে একটি কারখানায় খণ্ডকালীন কাজ করতেন তিনি।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক

_medium_1782221275.jpg)

_medium_1782219105.jpg)



