আর্জেন্টিনা কি সহজ জয় পাবে? জেনে নিন প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়ার আদ্যোপান্ত
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে অস্ট্রিয়া। প্রত্যাবর্তনের শুরুটাও হয়েছে স্বপ্নের মতো। জর্ডানের বিপক্ষে ৩-১ গোলে জয় পেয়েছে রাল্ফ রাংনিকের দল। এবার ‘জে’ গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হচ্ছে তারা । আজ ডালাসে যারা জিতবে তারাই চলে যাবে নকআউট পর্বে।
ফিফা বিশ্বকাপে এবারের আগে সাতবার অংশ নেওয়া অস্ট্রিয়া শেষবার বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৯৮ সালে। চলুন জেনে নেওয়া যাক অস্ট্রিয়া দলের আদ্যোপান্ত (Austria football team)।
অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: উয়েফা
সেরা বিশ্বকাপ: ১৯৫৪ (তৃতীয় স্থান)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: ফ্রান্স ১৯৯৮ (গ্রুপ পর্ব)
প্রথম বিশ্বকাপ: ইতালি ১৯৩৪
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৮ বার (১৯৩৪, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৯০, ১৯৯৮, ২০২৬)
সামগ্রিক বিশ্বকাপ রেকর্ড: ম্যাচ-৩০, জয়-১৩, ড্র-৪, হার-১৩, গোল দিয়েছে-৪৬, গোল খেয়েছে-৪৮।
ফিফা র্যাঙ্কিং: ২৩তম
অস্ট্রিয়ার প্রথম ও সর্বশেষ বিশ্বকাপ
উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে অংশ না নিলেও, চার বছর পর ইতালি ১৯৩৪ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়া ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ১৯৩১ সাল থেকে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ২৮ ম্যাচে মাত্র দুটি হারের রেকর্ডের কারণে তারা ‘ওয়ান্ডার টিম’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল।
সেবার তারা সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল ফ্রান্স ও হাঙ্গেরিকে হারিয়ে। তবে সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইতালির কাছে ১-০ গোলে হেরে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয় এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানির কাছে ৩-২ গোলে পরাজিত হয়ে তারা চতুর্থ স্থান অর্জন করে।
অস্ট্রিয়া শেষবার বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে অংশ নিয়েছিল ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে। হার্বার্ট প্রোহাস্কার অধীনে অস্ট্রিয়া গ্রুপ বি-তে ইতালি, ক্যামেরুন এবং চিলির বিপক্ষে লড়াই করে। সেই টুর্নামেন্টটি অস্ট্রিয়ার জন্য ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরপুর; আশ্চর্যজনকভাবে তারা তাদের তিনটি ম্যাচের প্রতিটিতেই দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমে গোল করেছিল। শেষ ম্যাচে ইতালির কাছে ২-১ গোলে হেরে তারা ২ পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নেয়, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা চিলির চেয়ে মাত্র এক পয়েন্ট কম ছিল।
অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা
বিশ্বকাপের আসরে অস্ট্রিয়ার হয়ে সর্বোচ্চ ৬টি গোল করেছেন এরিখ প্রোবস্ট। এই সবকটি গোলই এসেছিল ১৯৫৪ বিশ্বকাপে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ জয়ের ম্যাচে একমাত্র গোল দিয়ে শুরু করে তিনি চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ৫-০ জয়ের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন। এছাড়া কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে এবং সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষেও তিনি গোল করেছিলেন।
অস্ট্রিয়ার রেকর্ড বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
অস্ট্রিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি চারজন খেলোয়াড় যৌথভাবে ভাগ করে নিয়েছেন: ফ্রিডরিখ কোনসিলিয়া, এরিখ ওবারমায়ার, ব্রুনো পেজি এবং হার্বার্ট প্রোহাস্কা। এই চারজনই ১৯৭৮ এবং ১৯৮২ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার প্রতিটি ম্যাচে অংশ নিয়ে ১১টি করে ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন।
অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ জয়
অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়টি এসেছিল ১৯৫৪ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে, যেখানে তারা ৫-০ ব্যবধানে জয় পায়। প্রোবস্টের হ্যাটট্রিক ও স্তোয়াসপালের জোড়া গোলে সেই জয়টি নিশ্চিত হয়েছিল। সেই আসরেই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে উরুগুয়েকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তারা বিশ্বকাপে তাদের সেরা অর্জনটি (তৃতীয় স্থান) নিশ্চিত করেছিল।
অস্ট্রিয়া কোচ: রাল্ফ রাংনিক
২০২২ সালের এপ্রিল থেকে দায়িত্ব পালন করা রাংনিকের কোচ ও স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। মূলত নিজ দেশ জার্মানিতে স্টুটগার্ট, হ্যানোভার, হফেনহাইম ও শালকের মতো ক্লাবগুলোতে তিনি কাজ করেছেন। তবে তিনি বিশ্বজুড়ে বেশি পরিচিত ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আরবি লাইপজিগের হয়ে তার অবিশ্বাস্য কাজের জন্য, যেখানে তিনি ক্লাবটিকে আঞ্চলিক লিগ থেকে বুন্দেসলিগার শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলেন।
বিশ্ব ফুটবলে ‘প্রেসিং’ কৌশলের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত রাংনিক অস্ট্রিয়া জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্বে ছিলেন। অস্ট্রিয়া দলকে তিনি ইউরো ২০২৪-এ তুলে দেন এবং বায়ার্ন মিউনিখের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে জাতীয় দলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার হাত ধরেই অস্ট্রিয়া দীর্ঘদিনের খরা কাটিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পায়।
আর্জেন্টিনার হুমকি হতে পারেন যারা
অস্ট্রিয়ার শক্তির কথা বলতে গেলে সবার আগে আসবে ডেভিড আলাবার নাম। দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার ক্লাব পর্যায়ে বায়ার্ন মিউনিখ ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন অসংখ্য শিরোপা। আলাবা প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি।
আর্জেন্টিনার নজরে শুধু আলাবাই নন, থাকবেন রোমানো স্মিডও। ভের্ডার ব্রেমেনের এই মিডফিল্ডার গত বুন্দেসলিগা মৌসুমে করেছেন ৪ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট। অস্ট্রিয়ার আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান শক্তি তিনি। মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সুযোগ তৈরি ও গোল করার সামর্থ্যও রয়েছে তার। তাই মেসিদের বিপক্ষে অস্ট্রিয়া যদি চমক দেখাতে চায়, তাহলে আলাবার অভিজ্ঞতা আর স্মিডের সৃজনশীলতাই হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা।
আর্জেন্টিনার সঙ্গে হেড টু হেড
আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার লড়াইয়ের ইতিহাস খুব বেশি নেই। পূর্বে তাদের দেখা হয়েছিল কেবল প্রীতি ম্যাচে এবং সবশেষ লড়াইটাও আজ থেকে ৩৬ বছর আগে। ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। ১৯৯০ সালের ৩ মে, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে সেই ম্যাচ খেলতে নেমেছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার দল। ৩ মিনিটেই মানফ্রেড জাকের গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। আধঘণ্টা পার হতেই হোর্হে বুরুচাগার গোলে সমতা ফেরায় তারা।
তার আগে ১৯৮০ সালেও বিশ্ব জয়ী আর্জেন্টিনা অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হয়। ভিয়েনাতে সেই প্রীতি ম্যাচে ৬৭ হাজারের বেশি দর্শক এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়। ওই ম্যাচে ম্যারাডোনা হ্যাটট্রিক করেছিলেন, যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র হ্যাটট্রিক হয়ে রয়েছে। ৩ ও ১০ মিনিটে সান্তিয়াগো সান্তামারিয়া ও লিওপোলদো লুকুয়ে ২-০ গোলে এগিয়ে দেন আর্জেন্টিনাকে। পাঁচ মিনিট পর ম্যারাডোনা তার ক্যারিয়ারের পঞ্চম গোল করেন।
২০ মিনিটে কুর্ট জারা একটি গোল শোধ দিলে ম্যারাডোনা শেষ অর্ধে আরও দুটি গোল করেন। ক্যারিয়ারের পঞ্চম ম্যাচে প্রথম ও শেষ হ্যাটট্রিক করেন তিনি। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা জেতে ৫-১ গোলে। পরে পাঁচবার জোড়া গোল করলেও আর তিন গোলের দেখা পাননি এই আর্জেন্টাইন গ্রেট।
দুটি প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৬ গোল দিয়ে খেয়েছে দুই গোল। এবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত দলটি জয়ে ফিরতে পারে কি না সেটাই দেখার অপেক্ষা। অবশ্য দুই দলের মধ্যে একটি আনঅফিসিয়াল ম্যাচ হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ২৫ জুন, ১-০ গোলে জিতেছিল অস্ট্রিয়া।
অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার- প্যাট্রিক পেনৎস, আলেকজান্ডার শ্লাগার, ফ্লোরিয়ান উইগেলে
ডিফেন্ডার- ডেভিড আফেনগ্রুবার, ডেভিড আলাবা, কেভিন ডানসো, মার্কো ফ্রিডল, ফিলিপ লিনহার্ট, ফিলিপ মভেনে, স্টেফান পসখ, আলেকজান্ডার প্রাস, মাইকেল সভোবোদা
মিডফিল্ডার- ক্রিস্টফ বাউমগার্টনার, কার্নি চুকুয়েমেকা, ফ্লোরিয়ান গ্রিলিচ, কনরাড লাইমার, মার্সেল সাবিৎসার, জাভের শ্লাগার, রোমানো শ্মিড, আলেসান্দ্রো শপফ, নিকোলাস সাইভাল্ড, পল ভানার, প্যাট্রিক ভিমার
ফরোয়ার্ড- মার্কো আরনাউটোভিচ, মাইকেল গ্রেগোরিচ, সাশা কালাইডজিচ।
মন্তব্য করুন









