আমার বাবা-আমি বাবা এবং বাবা সত্তার এক অভিন্ন মেলবন্ধন
শীতের সকালে পুকুর পাড়ের নারিকেল গাছের ফাঁক গলে নরম রোদ এসে আমাদের বারান্দায় লুটোপুটি খায়। অনেক ছোট আমি। সবে টু থ্রীতে পড়ি। প্রতি সকালে নিয়মিত বারান্দায় মাদুর পেতে আব্বার সাথে পড়তে বসি। যোগ-বিয়োগ অংক শিখি। খড়ির চুলায় রান্নার জন্য বারান্দার এক পাশে কাঠের চেলা গুছিয়ে রেখেছেন মা। তার পাশেই বসে আমরা বাপ-ছেলে অংক করছি। অনেকের ধারণা ছোটবেলা থেকেই আমি কিছুটা ভালো ছিলাম, পড়াশুনায়। যদিও বড়ো বেলায় এসে সে ভুল সবার ভেঙেছে, সেই ধারাবাহিকতা মিলিয়ে গেছে মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে। যাই হোক...! স্পষ্ট মনে পড়ে একদিন সকালে আব্বার সাথে বারান্দায় বসে অংক করছি। আমাদের সময়ে দিস্তা কাগজের খাতা ফাউন্টেন পেন এবং পেন্সিল ছিলো। (ফাউন্টেন পেন পেয়েছি অনেক পরে) অংক করছি, একটা অংক শেষ হলে আনন্দে কিংবা ছেলেমানুষীর কারণে হাতের পেন্সিলটা উপরে ছুঁড়ে দিয়ে আবার সেটা ধরার চেষ্টা করতাম কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রতিবারই পেন্সিলটা নিচে পড়ে যেতো। বারান্দা একটু উঁচু হওয়ায় আব্বা কয়েকবার যত্নসহকারে তুলে দিলেন। আবারও একই ঘটনা। আব্বা মেজাজ হারিয়ে ফেললেন। তার সেটা স্বভাবও ছিলো-অল্পে রেগে যাওয়া। আব্বা মায়ের গুছিয়ে রাখা কাঠের চেলা থেকে একটা হাতে তুলে নিলেন এবং আমাকে অনেক মারলেন। পরে মা এবং চাচার হস্তক্ষেপে রক্ষা পেলাম।
আমাদের এলাকার মধ্যে আব্বা ছিলেন সেই সময়ের হাতেগোনা দু’একজন ভালো ছাত্রের মধ্যে একজন। বি-এড, এম-এড করা। নিজেকে নিয়ে তার অনেক অহংকার ছিলো। সহজে সবার সাথে মিশতেন না। নিয়মের মধ্যে চলার ক্ষেত্রে খুব কঠোর ছিলেন পরিবারের সদস্যদের প্রতি। সেই মানুষটা আমাদেরকে সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সীমাহীন পরিশ্রম করতেন। প্রথম জীবনে উনি প্রাইমারীস্কুল শিক্ষক ছিলেন। প্রায় চৌদ্দ মাইল সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতেন। পরে সহযোগী শিক্ষা অফিসার এবং শেষ বয়সে প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকদের ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের ইন্সট্রাক্টর ছিলেন। আমরা অনেকগুলো ভাইবোন। বাবার শাসনের বেড়াজালে কিছুটা হলেও মানসিক টানাপোড়নে বড়ো হলাম! বড়ো মানুষ না হলেও অমানুষ হইনি কেউই।
আমিও বাবা হলাম। আমার জীবনের ব্রত সেট করলাম। সন্তানের জন্য কখনই আমার বাবার মত কঠোর বাবা হবো না। তাদের জন্য বাজেভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করলাম। পৃথিবীতে হয়তো সব বাবা তার সন্তানের জন্য তাই করে। আমিও। প্রশ্ন হলো কঠোর উদার গড়িব ধনি কুলি মজুর ব্যবসায়ী চাকুরীজীবী উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত, অবস্থান সমাজের যেখানেই হোক না কেনো “বাবা” সত্তা এক অভিন্ন। হ্যা, কিছু ব্যতিক্রম হয়তো আছে পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে তবুও নিরবে নিভৃতে সন্তানের জন্য নিজেকে উজার করে দেয়াই বাবাদের ধর্ম। বাবারা সন্তানের জন্য শেষ ভরসার জায়গা।
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ‘বিশ্ব বাবা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রঙিন হয়ে ওঠে দামি উপহার আর সুদৃশ্য কেকের ছবিতে। কিন্তু এই উৎসবের বাহ্যিক ঝলমলে আলোর বাইরে সমাজের নানা প্রান্তে বা উপেক্ষিত কোণেও লুকিয়ে আছে অনেক সংগ্রামী বাবার সীমাহীন ত্যাগ আর বীরত্বের গল্প। সেটা আমরা ক’জন জানি! আজ যে বাবা দিবস নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত মাতামাতি, তার পেছনেও রয়েছে এক লড়াকু বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার গল্প।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯১০ সালের ১৯ জুন আমেরিকার ওয়াশিংটনে প্রথম বাবা দিবস পালিত হয়। এর নেপথ্যে ছিলেন সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক নারী। তাঁর মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়ার পর, তাঁর বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট একাই মা এবং বাবার দায়িত্ব পালন করে সোনোরাসহ তাঁর পাঁচ ভাইবোনকে বড় করেছিলেন। এই সৈনিকবাবার নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও লড়াইকে সম্মান জানাতেই সোনোরা ডড বিশ্বজুড়ে বাবা দিবস পালনের উদ্যোগ নেন, যা ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনের হাত ধরে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এদিনটিকে রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন।
বাবাকে ভালোবাসার জন্য একটি বিশেষ দিবস কি যথেষ্ট? না! বাবাকে হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসতে হবে। একটি সত্য ঘটনা মনে পড়ে গেলো। আমার কলিগ হঠাৎ করে কিডনি রোগে আক্রান্ত হলেন। ঢাকায় অনেক বড়ো বড়ো ডাক্তার দেখানো হলো। এক সময় ভুল চিকিৎসায় তার দুটো কিডনিই ড্যামেজ হয়ে গেলো। দীর্ঘদিন ডায়ালাইসিস করে চলার পরে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করার সিদ্ধান্তে আসলো তার পরিবার। ঢাকায় আইনি জটিলতা এবং চিকিৎসার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকায় দিল্লির একটি হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করার সিদ্ধান্ত হলো। আসল গল্প এটা নয়। গল্পটা খুব হৃদয়বিদারক! আমি সেই রোগির অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে দিল্লিতে গেলাম। ওখানে একটা ছেলের সাথে আমার পরিচয়। আঠারো বিশ বছর বয়স হবে হয়তো। গায়ের রঙ শ্যামলা। চেহারায় মায়া আছে। মুখমন্ডল সুন্দর। কথায় কথায় জানতে পারলাম সে তার কিডনি বিক্রি করার জন্য দিল্লিতে গেছে। আহারে! আমার ভেতরটা দুমরে-মুচরে গেলো! ছোট করে গল্পের আরও একটু গভিরে যাওয়া যাক। যে পরিবারে সে মানুষ- পরিবারটি গরিব। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা। সে দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করছে। চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের জন্য চাচার কাছ থেকে অনেক টাকা লোন করেছে। বাড়ীর যায়গাটুকু দিয়ে দিলেও চাচার লোন শোধ হবে না। অন্যদিকে বাবাকেতো ফেলে দিতে পারবে না! চিকিৎসা চালাতে হবে। তাই সে বাধ্য হয়ে কিডনি বিক্রি করছে! ভাবা যায়! বাবার জন্য ছোট্ট ছেলেটির নিষ্পাপ জীবটা উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি!! হায়রে নিয়তি! দালালদের দৌরাত্ম্যে কয়টাকাই বা সে পাবে! বাবার জন্য এই সন্তানের ভালোবাসার মূল্য কি পরিমাপ যোগ্য!
পিতৃত্বের একটি বড় দিক হলো সন্তানের সামনে নিজেকে সততা এবং নিয়মানুবর্তিতার এক জীবন্ত আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলা। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-এর জীবন এক অনন্য উদাহরণ হতে পারে।
বাবা হিসেবে জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, ডিসিপ্লিনড এবং চরম মিতব্যয়ী। তিনি ছিলেন একাধারে স্নেহশীল কিন্ত আদর্শের জায়গায় অত্যন্ত কঠোর, যিনি তাঁর সন্তানদের কোনো রাজকীয় আভিজাত্য না দিয়ে সাধারণ ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপ্রধানের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দুই ছেলে, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো বড় করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকার পরও তাঁর সন্তানদের কোনো ধরনের বিশেষ বা বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে দেননি। তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের এক স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, জিয়াউর রহমানের নিজের পুরনো বা ছোট হয়ে যাওয়া শার্ট-প্যান্ট কেটে দর্জি দিয়ে তাদের দুই ভাইয়ের জন্য জামা তৈরি করা হতো। তারা সচরাচর বাসায় সেগুলোই পরতেন। বন্ধুদের দামী পোশাক দেখে অনুযোগ করলে তিনি বলতেন, “তোমাদের বাবা বড়লোক নয়, সামান্য কয়টা টাকার বেতনে চাকরি করেন। তার সামর্থ্যে যা আছে, তোমাদের তাই পরতে হবে।”
আরও পড়ুনরাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর বরাদ্দকৃত সুযোগ-সুবিধা যাতে সন্তানরা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে তিনি কড়া নজর রাখতেন। সন্তানদের যাতায়াত বা ব্যক্তিগত কোনো কাজের জন্য রাষ্ট্রপতির গাড়ি কিংবা বঙ্গভবনের অতিরিক্ত সুযোগ ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। তিনি চাইতেন তাঁর সন্তানরা সাধারণ মানুষের মতোই বড় হোক। সন্তানদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন রুটিনের ব্যাপারে তিনি খোঁজখবর রাখতেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারকে যেটুকু সময় দিতেন, সেখানে সন্তানদের নৈতিকতা, সততা এবং দেশপ্রেমের শিক্ষা দেওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে তীব্র রোদ কিংবা কাঁদা-পানিতে দাঁড়িয়ে যে কৃষক বাবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন, তাঁর জীবনের মূল ফসল কিন্তু ক্ষেতের ধান নয়, তাঁর সন্তান। গ্রামীণ জনপদের এই প্রান্তিক বাবারা খরা, বন্যা কিংবা ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার হতাশার মাঝেও একটি বিষয়ে কখনো আপস করেননা তা হলো সন্তানের পড়াশোনা। নিজের পায়ে ছেড়া সেন্ডেল জোটে না চৈত্র মাসে ফেটে চৌচির হওয়া জমিতে খালি পায়ে হাঁটেন, কিন্তু সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে কখনো দেরি করেননা।
সন্তান যখন দেশের স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, বিসিএস অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোনো কর্পোরেট হাউজের কর্মকর্তা হয় তখন তার আনন্দের সীমা থাকে না। জ্যাঁ-জ্যাক রুসো বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি তার বাবার দায়িত্ব পালন করতে পারে না, তার বাবা হওয়ার কোনো অধিকার নেই।”
ইতিহাসের প্রথম বাবা দিবসের সেই উইলিয়াম স্মার্টের মতোই আমাদের সমাজে এমন অনেক বাবা আছেন, যাঁরা একাধারে বাবা এবং মা। রিকশাচালক সামাদ মিয়া (ছদ্মনাম) তেমন একজন সিঙ্গেল ফাদার। ১০ বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর অনেকেই তাঁকে আবার সংসার পাতার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সামাদ মিয়ার ভয় ছিল, নতুন কেউ এসে যদি তাঁর অবুঝ দুটি সন্তানকে অবহেলা করে! দিনের বেলা রিকশা চালিয়ে রাতে এসে ক্লান্ত শরীরে সন্তানদের জন্য রান্না করা, তাদের চুল বেঁধে দেওয়া, আর গভীর রাতে ঘুমন্ত সন্তানের কপালে হাত বুলিয়ে দেওয়া সামাদ মিয়ার জীবন ছিল এক অনন্ত যুদ্ধের নাম। সিগমুন্ড ফ্রয়েড লিখেছিলেন, “শৈশবে বাবার সুরক্ষার চেয়ে তীব্র কোনো চাহিদার কথা আমার মনে পড়ে না।” সামাদ মিয়া তাঁর সন্তানদের সেই সুরক্ষার পাশাপাশি মায়ের আঁচলের ওমটাও একাই দিয়েছেন। তাঁর বড় মেয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে, এখন সামাদ মিয়ার এই একাকী লড়াইকে আমরা কোন মহাকাব্যের সাথে তুলনা করবো?
লেখক :
এস এম হুমায়ুন কবির
প্রশিক্ষক ও নির্মাতা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








