জি৭ সম্মেলনে লেবাননে যুদ্ধবিরতির আহ্বান নেতাদের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁস শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে বিশ্বনেতারা লেবাননে অবিলম্বে ও শক্তিশালী যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি নেতারা এই দাবি তোলেন। মূলত ইরান ও লেবাননে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির পর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্বনেতারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুসারে, চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে এই প্রণালির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা এবং ঝুঁকি কমাতে জ্বালানি সরবরাহের পথ বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন জি৭ নেতারা।
এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে লেবানন ও ইসরায়েল পরিস্থিতি। গত মার্চে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালানোর পর বর্তমানে সেখানকার একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে। ফলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রকাশ্য দূরত্বের সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প শীর্ষ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ইসরায়েল যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে তাতে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন। বৈঠকে বসার সময় ট্রাম্প স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিজেকে বস বলে রসিকতাও করেন।
রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা
জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আরেকটি অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ। সম্মেলনে বিশ্বনেতারা ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সফল ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী করতে পেরেছে। এতে আলোচনার টেবিলে কিয়েভের দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে বলে নেতারা মনে করছেন। রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ আরও বাড়াতে জি৭ দেশগুলো নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে। এর মূল লক্ষ্য থাকবে রাশিয়ার জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাত। ইউক্রেনকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চীনের ওপর নির্ভরতা মোকাবিলায় মনোযোগ
সম্মেলনে ফ্রান্সের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহের নিরাপত্তা। বিশেষ করে বিরল খনিজ উপাদানের ক্ষেত্রে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনার জন্য একটি যৌথ বিবৃতি চূড়ান্ত করতে অংশীদারদের চাপ দিচ্ছে ফ্রান্স।
বিগত বছরে বেইজিং খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করায় পশ্চিমা বিশ্বের জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ‘দ্বিতীয় চীন ধাক্কা’ মোকাবিলায় পশ্চিমা শক্তিগুলো খনিজ প্রক্রিয়াকরণ ও পুনর্ব্যবহার ক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। বিশ্ব বাণিজ্যকে পুনর্ভারসাম্য করতে এবং চীনের প্রতিযোগিতা রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত খনিজ বাণিজ্য ব্লকের কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা করেন তারা।
ইউরোপে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম হ্রাস
শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনীর সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউরোপের প্রতিরক্ষার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেই আরও বড় দায়িত্ব ও খরচের অংশীদারিত্ব নেবে–এটিই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও ন্যায্য।’
রাশিয়ার মতো প্রতিবেশী পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য ইউরোপ কেন এখনও আট ঘণ্টার উড়াল দূরত্বের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল থাকবে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন ন্যাটোপ্রধান। তিনি স্পষ্ট করেন, ওয়াশিংটন তার প্রথাগত প্রতিশ্রুতি এবং পারমাণবিক ছত্রছায়ায় আগের মতোই যুক্ত থাকবে, তবে ইউরোপকে নিজের সামরিক বাজেট বাড়াতে হবে।
জি৭ বা গ্রুপ সেভেনের দেশগুলো হলো–যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও জাপান।
মন্তব্য করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


_medium_1781700694.jpg)





