ভিডিও সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৫ জুন, ২০২৬ ০৩:৫৭ পিএম

মহাস্থানগড় ও বগুড়ার করতোয়া নদী

যখন বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংকট আর প্রকৃতি রক্ষার স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ঠিক তখন উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার এবং প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী বর্তমান মহাস্থানগড় তথা বগুড়ার পরিবেশগত বিপর্যয় আমাদের এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে প্রাচীন সভ্যতার অনন্য স্মারক ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের পরিবেশগত সংকট, অন্যদিকে এ অঞ্চলের প্রাণরেখা খ্যাত করতোয়া নদীর বর্তমান নাজুক মরণদশা সব মিলিয়ে বগুড়া জেলার সামগ্রিক পরিবেশ আজ চরম হুমকির মুখে।

আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী মহাস্থানগড় ও এর চারপাশের এলাকা এখন পরিবেশগত সংকটে জর্জরিত। প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিন দিন তার স্বাভাবিকতা হারাচ্ছে। মহাস্থানগড় মাজার শরীফ, সাদা পাথর, জীয়তকুন্ডু, জাদুঘর, বৈরাগীর ভিটা কিংবা বেহুলার বাসর ঘর দেখতে প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার পর্যটক আসেন। দর্শনীয় স্থান উপভোগের পাশাপাশি অনেকেই এখানে বনভোজন বা পিকনিকের আয়োজন করেন। কিন্তু বিনোদন শেষে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক কাপ, প্লেট, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিন যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। প্রাচীন এই দুর্গের মাটির উর্বরা শক্তি ও জীববৈচিত্র্য এই প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি এই ঐতিহাসিক স্থানটি হারাচ্ছে তার চিরন্তন নান্দনিকতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন গাছ-গাছরা ও মাটিকাটার মহোৎসব। ঐতিহাসিক এই গড় ও আশেপাশের টিলাগুলো কেটে বৃক্ষ উজাড় করা হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক উপায়ে মাটি ও ইট- পাথর উত্তোলনের ফলে প্রাচীন ভূ-প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। 

মহাস্থানগড়ের এই সংকটের সমান্তরালে বগুড়া শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক করতোয়া নদী এখন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অথচ একসময় এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল মহাস্থানগড়ের মতো প্রাচীন নগরী এবং ব্যবসা-বাণিজ্য। আজ সেই নদীর দুই পাড় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে। পাকা দালানকোঠা, দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে নদীকে সংকুচিত করতে করতে এখন একটি সরু ড্রেনে পরিণত করা হয়েছে। শুধু দখলই নয়, বগুড়া পৌরসভার প্রধান বর্জ্য ফেলার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই নদী। শহরের শত শত ড্রেনের বিষাক্ত তরল বর্জ্য, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য এবং পলিথিন সরাসরি এসে পড়ছে এখানে। বর্তমানে করতোয়ার পানি এতটাই দূষিত যে, তা জলজ প্রাণীর বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে নদী থেকে যে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়, তা আশেপাশের বাসিন্দা এবং পথচারীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শুধু করতোয়া বা মহাস্থানগড়ই নয়, সামগ্রিকভাবে বগুড়া জেলার পরিবেশগত সূচকগুলো দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশ হওয়ায় এবং অতিরিক্ত অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচকাজ ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে বগুড়ায় প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় গ্রীষ্মকালে সাধারণ টিউবওয়েলে আর পানি মিলছে না। এর ওপর যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। শহরের ভেতরে থাকা প্রাচীন পুকুর, দীঘি ও নিচু জলাশয়গুলো ভরাট করে আবাসন তৈরি করায় সামান্য বৃষ্টিতেই বগুড়া শহরে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের মূল চেতনাকে ধারণ করে বগুড়ার এই পরিবেশগত বিপর্যয় রুখতে হলে এখনই সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।  অবিলম্বে করতোয়া নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা প্রথম কাজ। একই সাথে নদীতে শহরের নোংরা পানি ও বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে পৌরসভার(প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের) তরল বর্জ্য শোধনের জন্য ‘ইটিপি’ (Effluent Treatment Plant) স্থাপন এবং নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে উৎস মুখ থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ অংশে ক্যাপিটাল ড্রেজিং বা বৈজ্ঞানিক উপায়ে পুনঃখনন করতে হবে। অন্যদিকে, মহাস্থানগড় কোর এরিয়া এবং এর আশেপাশে পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একে ‘গ্রিন জোন’ ঘোষণা করা দরকার। গড়ের আশে পাশে এবং করতোয়ার দুই পাড়ে দেশীয় প্রজাতির ফলদ ও ঔষধি গাছের ব্যাপক বনায়ন করতে হবে, যা মাটির ক্ষয়রোধ করবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে জেলার ঐতিহ্যবাহী খাল, দীঘি ও পুকুরগুলো পুন:খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা আজ সময়ের দাবি। কিছুদিন পূর্বে বগুড়া ডিসি অফিসের পাশে করতোয়া নদীর সামান্য কিছু অংশের সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে নিঃসন্দেহে যা প্রশংসার দাবি রাখে। এর সুফল যাতে সর্বস্তরের জনগণ পায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি যেন হারিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। নদীকে ঘিরে পরিবেশবান্ধব নতুন প্রকল্প তৈরি করে সবুজায়নের মাধ্যমে বগুড়াকে একটি স্নিগ্ধ ও প্রাণবন্ত নগরীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। 

মহাস্থানগড় আমাদের গৌরবময় অতীত, আর করতোয়া নদী আমাদের বেঁচে থাকার বর্তমান। অতীতকে ধ্বংস করে এবং বর্তমানকে বিষাক্ত করে কোনো অঞ্চল টেকসই হতে পারে না। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বগুড়াবাসীর প্রধান অঙ্গীকার হোক দখল-দূষণ মুক্ত করতোয়া আর সবুজ-পরিচ্ছন্ন মহাস্থানগড়। প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের জনগণের যৌথ প্রয়াসই কেবল পারে আমাদের এই প্রিয় জনপদকে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে রেখে যেতে। 

আরও পড়ুন

লেখক :


আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু

সহকারী অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মহাস্থানগড় ও বগুড়ার করতোয়া নদী

এবারের বিশ্বকাপ থেকে শান্তির আনন্দ উধাও হয়ে গেছে : ইরানী অধিনায়ক

ইসরায়েলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনে নয়, জেরুজালেমে হবে : বেন গভির

আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশ নিয়ে রহস্য, অনুশীলনেও চমক স্কালোনির

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় নাখোশ ইরানী কট্টরপন্থীরা

জাহেদের সঙ্গে হওয়া ঘটনার বিষয়ে সরকার ব্যবস্থা নেবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী