ভিডিও শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৫ জুন, ২০২৬ ১১:১১ পিএম

নকশার জাদুতে কর্পোরেট ক্যারিয়ারকে বিদায় আইবিএ গ্র্যাজুয়েট  জান্নাতের ‘ছাপ্পা’র গল্প

নকশার জাদুতে কর্পোরেট ক্যারিয়ারকে বিদায় আইবিএ গ্র্যাজুয়েট  জান্নাতের ‘ছাপ্পা’র গল্প

নিজের আলোয় ডেস্ক: বহুজাতিক কোম্পানির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ আর গতানুগতিক কর্পোরেট চাকরির হাতছানি উপেক্ষা করে কেবল রঙের প্রতি ভালোবাসা আর কাঠের ব্লকের শব্দকে সঙ্গী করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা জান্নাত রফিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করা এই সাধারণ শিক্ষার্থীর জীবন আজ বদলে গেছে এক শখের হাত ধরে। বর্তমানে তিনি কেবল একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, বরং প্রতি মাসে তার আয়ের অঙ্ক দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ব্লকের কাজের প্রতি জান্নাতের গভীর অনুরাগ তৈরি হয়েছিল। নিজের তৈরি করা ডিজাইনের পোশাক পরে তিনি ক্যাম্পাসে যেতেন এবং তার নকশা দেখে বন্ধুবান্ধবরা প্রায়ই প্রশংসা করতেন। 

একদিন প্রতিবেশীর অনুরোধে বাচ্চাদের জন্য জামা এবং পরবর্তীতে কিছু শাড়ি ডিজাইন করার মধ্য দিয়েই তার ব্যবসায়িক স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়। কাঠ ব্লকের নকশা এবং ব্লকে রং মেখে কাপড়ে ছাপ দেওয়ার সেই সরল ধারণা থেকেই তিনি তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখেন ‘ছাপ্পা’। পড়াশোনা শেষে যখন জান্নাত পুরোদমে ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন সমাজ ও পরিবারের দিক থেকে প্রথাগত প্রশ্ন আর মানসিক চাপ আসতে শুরু করে। বন্ধুদের ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়া আর আইবিএ-র মতো নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ে ব্যবসা করার সিদ্ধান্তকে সহজে মেনে নিতে পারছিল না পরিবার। সবার মন রাখতে তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি শুরু করলেও অল্প দিনেই বুঝতে পারেন, আট ঘণ্টা শ্রম দিয়ে চাকরি থেকে যে বেতন পাচ্ছেন, নিজের শখের ব্যবসা থেকে তার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি আয় হচ্ছে। এই বাস্তব উপলব্ধি থেকেই তিনি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি উদ্যোক্তা হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। জান্নাত মনে করেন, যে কোনো নারীর ব্যবসায়িক সাফল্যে পরিবারের সমর্থন অপরিহার্য। 

তার এই যাত্রায় স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ির কাছ থেকে পাওয়া নিঃশর্ত ভালোবাসা বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে শাশুড়ি তাকে ব্যবসায় সময় দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ইসলাম নগর লাব্বায়েক মোড়ে ‘ছাপ্পা’র একটি নিজস্ব শোরুম রয়েছে, যা গত তিন বছর ধরে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। শাড়ি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও জান্নাতের ‘ছাপ্পা’ এখন কুর্তি, শীতের চাদর ও ব্লাউজ নিয়ে বড় পরিসরে কাজ করছে। শুধু দেশি পণ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং দেশের বাইরে চীন থেকে ম্যাসাজের জুতো, লেডিস ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, ক্রুশেটের পোশাক, শিশুদের বিভিন্ন আইটেম এবং সিরামিকের শোপিস’সহ নানা নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরাসরি আমদানি করছেন। পাশাপাশি নারীর অন্তর্বাস নিয়ে কাজ করার জন্য ‘সিক্রেট এমব্রেস’ নামে তার একটি আলাদা গ্রুপও রয়েছে। চাকরি ছাড়ার পর গত এক বছরে জান্নাত তার এই ব্যবসাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছেন। 

আরও পড়ুন

বর্তমান বাজারে অনলাইন উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বৃদ্ধিকে জান্নাত অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখেন। তবে প্রতিযোগিতার এই বাজারে ‘ছাপ্পা’র মূল শক্তি হলো পণ্যের মান, স্বচ্ছতা ও সততা। ই-কমার্সের দুনিয়ায় ক্রেতাদের নিখাদ বিশ্বাস অর্জন করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জান্নাত শুরু থেকেই তার কারখানার নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়ার লাইভ ভিডিও, পণ্যের আসল ছবি এবং প্যাকেজিংয়ের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে ক্রেতাদের পূর্ণাঙ্গ ধারণা দিয়ে আসছেন। ব্যবসার পরিধি বাড়লেও জান্নাত রফিকের কাছে সংখ্যার চেয়ে গ্রাহকের সন্তুষ্টি ও আস্থাই সবচেয়ে বড় মূলধন। ভালো মানের পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে তিনি সব ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী এড়িয়ে সরাসরি মূল উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। গ্রাহকদের যেকোনো অভিযোগ বা গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে দ্রুত তা সমাধানের মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করা হয়। এই সফল উদ্যোক্তার মতে, বাংলাদেশে নারীদের ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও সহজ করতে সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল মার্কেটিং সহায়তার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। সেই সাথে একটি নিরাপদ অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা, কম খরচে নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি সুবিধা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব টেকসই নীতিমালা তৈরি করা গেলে দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতটি অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিয়েতে খাসির বদলে মুরগি, দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১২

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৃদ্ধা আয়েশা হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন

১৭ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে সময় লাগবে: হুইপ জি কে গউছ

হাম উপসর্গে আরো ৩ শিশুর মৃত্যু

পাহাড় ধস: প্রকৃতির সতর্কবার্তা, আমরা কতটা প্রস্তুত

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা হচ্ছে, সহায়তা দেবে সরকার: কৃষিমন্ত্রী