বন্ধুত্ব কি পকেটের ওজনের ওপর নির্ভরশীল?
লাইফস্টাইল ডেস্ক : পেট চালাতে পিৎজা ডেলিভারির কাজ করছেন এক তরুণ। রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয় স্কুলজীবনের এক বান্ধবীর সঙ্গে। কথাবার্তা শুরু হতেই আসে তাচ্ছিল্যের হাসি, কটাক্ষ। মুহূর্তটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সত্যতা যাচাই করা না গেলেও এটি ছুঁয়ে গেছে অনেকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে অর্থ শুধু প্রয়োজন নয়-এটি মর্যাদা, তুলনা এবং চাপের প্রতীক হিসেবেও কাজ করে। অর্থের কারণে আবেগ অনেক সময় সহজেই চাপা পড়ে যায়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের জীবন, ভ্রমণ বা ভোগবিলাস চোখে পড়লে, নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো কাঁধে চেপে বসে।
মানুষের আর্থিক অবস্থা বন্ধুত্বের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। পকেটের ভেতরের অবস্থা অর্থাৎ আর্থিক সক্ষমতা এবং ব্যয় ক্ষমতা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, উপহার দেওয়া বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। যখন এক বন্ধুর পকেট শক্তিশালী, আরেকটির সীমিত থাকে, তখন ছোটখাটো বিষয়েও লজ্জা বা বিরক্তি জন্ম নিতে পারে।
আর্থিক বৈষম্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব
দীর্ঘদিনের গবেষণাও বলছে, সমাজে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অনেক তরুণই সমবয়সীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নিজের সামর্থ্যের বাইরে খরচ করেন এবং ঋণের বোঝা বাড়ান।
রাজনীতি বা স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও নিজেদের আর্থিক বাস্তবতা নিয়ে মুখ খোলায় দ্বিধা বোধ করে। এই দ্বন্দ্ব বন্ধুত্বের ভেতরেও ফাটল ধরাতে পারে। সম্পদের ব্যবধান থেকে জন্ম নেয় ভুল বোঝাবুঝি, লজ্জা, ক্ষোভ বা হীনমন্যতা ধীরে ধীরে বহু বছরের বন্ধুত্বকেও দুর্বল করে দিতে পারে। এমন হলে যা করতে পারেন-
সম্পর্ককে বোঝা
বোঝাপড়ার বিষয়টি আসে নিজের ভেতর থেকে। আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা মানুষদের নিয়ে নিজের ভেতরের বিষয়গুলো জেনে নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিজের আবেগগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হয়। ঈর্ষা, হতাশা, লজ্জা বা অপরাধবোধ আসলে কোথা থেকে আসছে, তা বোঝা গেলে সম্পর্কের সমস্যা অনেকটাই দূর হয়। বন্ধুর ব্যক্তিগত গুণাবলি, তার প্রতি টান আর বন্ধুত্ব ধরে রাখার কারণগুলো মনে করিয়ে দেয়-অর্থই সব নয়।
খোলাখুলি আলোচনা
বন্ধুর সঙ্গে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি তুলতে গেলে দোষারোপ নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতাকে সৎভাবে তুলে ধরলেই সম্পর্কে ভিত মজমুত হয়। যেমন কোথায় গেলে সহজভাবে জানিয়ে দেওয়া ‘এটা বাজেটের বাইরে- এই সাধারণ কথাটিও অনেক সময় গভীর বোঝাপড়ার দরজা খুলে দেয়। কথা বলার সময় নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। একই সঙ্গে বন্ধুর কথাও মন দিয়ে শোনা জরুরি।
কম খরচে সময় কাটানো
কম খরচে একসঙ্গে সময় কাটানোর সৃজনশীল উপায় খুঁজে নেওয়া বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। পার্কে হাঁটা, ঘরে বসে আড্ডা, বই বা সিনেমা নিয়ে আলোচনা-এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই আসলে সম্পর্ককে গভীর করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একে অন্যের প্রতি যত্ন আর শ্রদ্ধা বজায় রাখা।
গবেষণা বলছে, ভিন্ন আর্থ-সামাজিক স্তরের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব সামাজিক গতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের নেটওয়ার্ক থেকেই আসে সুযোগ, তথ্য আর জীবনের দিকনির্দেশনা। তাই ভিন্ন বাস্তবতার বন্ধুদের আঁকড়ে ধরে রাখলে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কই নয়, পুরো সমাজও সমৃদ্ধ হয়। অর্থের ব্যবধান থাকতেই পারে, কিন্তু যোগাযোগ, সহানুভূতি আর বোঝাপড়াই পারে বন্ধুত্বকে টিকিয়ে রাখতে।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে
মন্তব্য করুন








