দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল গত বছরে বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শতাধিক
মাসুদুর রহমান রানা : দিন যত যাচ্ছে দীর্ঘ হচ্ছে সড়কে মৃত্যুর মিছিল। থেমে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় আগামীর স্বপ্ন। কেউ যেন দেখছে না, শুনছে না স্বজনদের আহাজারি। এত নিয়ম ও আইন তবুও থামানো যাচ্ছে না এই মৃত্যুর যাত্রা। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এখন প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম। প্রতিদিনই সারাদেশে সড়কে প্রাণ যাচ্ছে মানুষের।
এই ধারাবাহিকতায় বগুড়াতেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। নিভে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। গত ২০২৫ সালে বগুড়া জেলায় সড়কে নিহত হয়েছেন ১২০ জন। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিমাসে গড়ে বগুড়ায় ১০ জন করে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে একটি উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থী। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণরা বেপরোয়া গতিতে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে নিহত হচ্ছেন।
গতকাল সোমবার জেলা পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১২০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ১১৩টি মামলা হযেছে। এরমধ্যে বগুড়া সদর থানায় ২৬টি, শাজাহানপুর থানায় ১৮টি, শিবগঞ্জ থানায় ১৫টি, সোনাতলা থানায় একটি, গাবতলি থানায় চারটি,সারিয়াকান্দি থানায় একটি, আদমদিঘী থানায় পাঁচটি, দুপচাঁচিয়া থানায় চারটি,নন্দীগ্রাম থানায় ১৩টি, কাহালু থানায় চারটি, শেরপুর থানায় ২১টি ও ধুনট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এর আগের বছর ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে জেলায় মামলা হয়েছিল ১২৫টি। তবে বিশ্লেষকরা বলেন, বগুড়ায় সড়কে মৃত্যুর ঘটনা আরো বেশি। সব তথ্যই পুলিশ পায় না। অনেক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলে তা পুলিশকে জানানো হয় না। পুলিশকে জানালে আইনি প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে যেতে হয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায় এই কারণে স্বজনরা পুলিশকে সব সময় জানায় না।
অনেক সময় স্বজনরা আইনি ঝামেলা এড়াতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার বিষয়টি পুলিশকে জানাতে চান না। স্বজনরা পুলিশকে না জানিয়েই লাশ দাফন করে ফেলে। এ জন্য সব সময় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না।
এদিকে, হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিয়ন অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ এই পাঁচ জেলায় মহাসড়কে গত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩৩১ জন। আহত হয়েছে ২৪৬ জন। আর এসব দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৯৯টি।
আরও পড়ুনসড়ক দুর্ঘটনারোধে করণীয় বিষয়ে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মুহাম্মদ রায়হান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনারোধে সবার ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা দরকার। গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, বিভিন্ন সংগঠন, এনজিও, ছাত্রসমাজ, যাত্রী, চালক, পথচারীসহ রাষ্ট্রের জনগণকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। গণসচেতনতা বাড়াতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বগুড়া সদর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ টিআই (প্রশাসন) মো. সালেকুজ্জামান খাঁন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলো হলো-ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, হেলমেট ব্যবহার না করে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, বাস ও ট্রাকে অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন, ট্রাফিক আইন না মানা, চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা ও পথচারীদের রাস্তা পারাপারে অসচেতনতা, যেখানে যেখানে যাত্রী ওঠানামা করাসহ নানাবিধ কারণে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন মানলে এবং এ ব্যাপারে গণসচেতনতা বাড়াতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের বগুড়া জেলা সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান বলেন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতা, চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার না করা, মহাসড়কে সিএনজিচালিত আটোরিকশা ও মোটরসাইকেলগুলোর চালকদের লিংক রোড় বা পার্শ্বরোড ব্যবহার না করা, কার আগে, কে যাবে মহাসড়কে এই প্রতিযোগিতা, ওভারক্রসিং, অতিরিক্ত গতি ট্রাফিক আইন অমান্য করা, বিপজ্জনকভাবে বেপরোয়া গাড়ি চালানোসহ বিভিন্ন কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
এ ব্যাপারে গণসেচেতনতা বাড়াতে হবে। গণসচেতনতা বাড়লে দুর্ঘটনা কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, রাস্তায় গাড়ি, মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে নিজেকে যেন রাজা না ভাবি। এটিও মনে রাখতে হবে বাসায় প্রিয়জনরা অপেক্ষা করছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাগুলো যাতে না ঘটে সেদিকে সকলের দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। এজন্য প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা।
তাই সড়ক দুর্ঘটনারোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। চালক, মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে-মনে রাখতে হবে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তবেই নিরাপদ হবে সড়ক। কমবে মৃত্যুর মিছিল।
মন্তব্য করুন






_medium_1764257966.jpg)


