মিথ্যা তথ্যের জালে আটকে পড়া মানুষ
আজকের পৃথিবীতে আমরা সবাই যেন এক বিশাল বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি আর চারপাশে অসংখ্য মানুষ নানা কথা চিৎকার করে বলে যাচ্ছে। দূর থেকে সব কথাই সত্যি শোনায় সব ঘোষণাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বোঝা যায় অনেক কথাই ভুল, অনেক কথাই ভুয়া। সোশ্যাল মিডিয়াও ঠিক এমনই একটি বাজার যেখানে সত্য আর মিথ্যার আওয়াজ একসাথে মিশে যায়। আর মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে কোনটা বিশ্বাস করবে, কোনটা নয়। ভুল কথা যেমন মানুষকে ভুল পথে নেয়, তেমনি ভুয়া তথ্য আমাদের মনকে নাড়িয়ে দেয় কখনো ভয়, কখনো রাগ, কখনো আবার হতাশা তৈরি করে। এভাবেই অদৃশ্যভাবে আমাদের আবেগ, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এই মিথ্যা তথ্যের স্রোত। ডিজিটাল যুগে মানুষ তথ্যের ওপর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নির্ভরশীল। সকালবেলার ঘুম ভাঙা থেকে রাতে ঘুমানো পর্যন্ত, প্রতিটি মুহূর্তই সোশ্যাল মিডিয়ায় সংযুক্ত। খবর, মতামত, বিনোদন সব যেন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ভয়াবহ এক সমস্যা ভুয়া তথ্য বা ফেক নিউজ। এগুলো শুধু ভুল তথ্যই ছড়ায় না, মানুষের মনেও তৈরি করে ভয়, বিভ্রান্তি, রাগ, হতাশা ও ভুল বিশ্বাস। ফলে সমাজে বাড়ছে বিভক্তি, অবিশ্বাস এবং মানসিক অস্থিরতা।
ভুয়া তথ্য সত্য তথ্যের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ মিথ্যে তথ্য সাধারণত বেশি চমকপ্রদ, উত্তেজনাময় বা আবেগ-নির্ভর হয়। বাংলাদেশেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ কোনো তথ্য যাচাই না করেই শেয়ার করে থাকে। ব্যবহারকারীদের ৬০% কোনো খবরের উৎস যাচাই করেন না। ৪০% মানুষ আবেগের বশে ভুল তথ্য বিশ্বাস করেন এবং ৩০% ব্যবহারকারী ভুল তথ্যের কারণে উদ্বেগ বা রাগ অনুভব করেন। ভুয়া তথ্য এখন শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং একটি মানসিক ও সামাজিক সংকট। ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে।
তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসের অভাব। দ্রুত শেয়ার করার প্রবণতা মানুষকে ভাবার সময় দেয় না। প্ল্যাটফর্মগুলো এমন কনটেন্ট দেখায় যা ব্যবহারকারীর আবেগকে উত্তেজিত করে, ফলে মিথ্যে তথ্য দ্রুত ছড়ায়। কম ডিজিটাল শিক্ষাজ্ঞান। অনেকেই বোঝেন না কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি নয়। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে কিছু গোষ্ঠী ইচ্ছে করেই ভুয়া তথ্য ছড়ায় তাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য। মানুষ এমন তথ্যেই আকৃষ্ট হয় যা অদ্ভুত, ভয়ংকর বা আবেগ-উদ্দীপক। সবাই যা শেয়ার করছে, সেভাবেই অনেকে চোখ বন্ধ করে শেয়ার করে। অনেক ব্যবহারকারী এখনো জানে না কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়। ফলে তারা সহজেই একটি সাজানো ছবি বা এডিট করা ভিডিওকে বিশ্বাস করে ফেলে। ডিজিটাল লিটারেসির অভাব মিথ্যা তথ্যকে আরও শক্তিশালী করে। এখনকার দিনে মানুষ দীর্ঘ লেখা পড়ে না। সংক্ষিপ্ত পোস্ট, ছবি, মিম দেখে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই প্রবণতা ভুয়া তথ্যের জন্য বিশাল সুবিধা তৈরি করে।
স্কুল, কলেজে তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভুয়া তথ্য ছড়ানো অ্যাকাউন্ট ও পেজ শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। খবর শেয়ার করার আগে উৎস দেখার অভ্যাস গড়তে হবে। প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত ভুল তথ্য কমানোর জন্য অ্যালগরিদমে পরিবর্তন আনা। আবেগের মুহূর্তে কোনো পোস্ট শেয়ার করা উচিত নয়। বিশ্বাসযোগ্য মিডিয়া অনুসরণ করতে হবে। যাচাই করা সংবাদ মাধ্যমকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ায় বা মিথ্যা প্রচারণা করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে আইন যেন মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে লক্ষ্য হবে শুধু মিথ্যা ছড়ানো রোধ করা।
আরও পড়ুনসোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু ভুয়া তথ্যের ঝড় আমাদের মনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সত্য-মিথ্যার সীমারেখা যেখানে অস্পষ্ট, সেখানে বিচক্ষণতা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। তাই ব্যক্তিগতভাবে সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি। আমরা যদি নিজেরা যাচাই বাছাই না করি, তাহলে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের মন বিভ্রান্ত হতে থাকবে। ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হতে হবে নিজের হাত থেকেই কারণ সত্য রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু মিডিয়া বা সরকারের নয়, প্রতিটি সচেতন মানুষের।
ফারিহা জামান নাবিলা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








