সান্তাহার রেল নগরীর হারানো জৌলুস ও নবজাগরণ
উত্তরবঙ্গের রেল নগরী আজ অবহেলিত, অথচ সামান্য উদ্যোগেই জেগে উঠতে পারে নতুন প্রাণে বাংলার উত্তর জনপদের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শহর সান্তাহার একসময় যার নাম ছিল আধুনিকতার প্রতীক। রেলগাড়ির শহর, ইঞ্জিনের হুইসেল আর স্টিমের ধোঁয়ার সঙ্গে যার ইতিহাস জড়িয়ে আছে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে। বগুড়া জেলার আদমদিঘী উপজেলার একমাত্র পৌরসভা এই শহরটি। আয়তনে মাত্র ১৬ বর্গকিলোমিটার হলেও, এর অতীতের আভিজাত্য ছিল উত্তরবঙ্গের গর্বের অংশ।
ঐতিহ্যের স্মৃতি রেলই যার প্রাণ, ব্রিটিশ আমলে সান্তাহার গড়ে ওঠে রেলওয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে। এখানে নির্মিত হয়েছিল রেলওয়ে ইয়ার্ড, লকোমোটিভ ক্যারেজ, অফিসারর্স বাংলো, সাহেবদের উপাসনালয় (চার্চ), এমনকি ১৯২৭ সালে স্থাপিত হয়েছিল ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র যেখান থেকে বাংলার উত্তরাঞ্চলে প্রথম জ্বলে ওঠে বৈদ্যুতিক বাতি। সেই সময় সান্তাহার ছিল প্রাণচঞ্চল শহর যেখানে রেলওয়ে হাসপাতাল, লন টেনিস গ্রাউন্ড, এমনকি ঠান্ডা ও গরম পানির ফোয়ারা পর্যন্ত ছিল রেলওয়ে স্টেশনে। কিন্তু আজ সেসব কেবল স্মৃতি। রেলওয়ে শহরটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়েছে তার জৌলুস, বিলুপ্ত হয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর অনেকাংশ।
বর্তমান সান্তাহার যেন এক সমস্যার শহর, আজকের সান্তাহার যেন এক ইতিহাসবাহী অথচ অবহেলিত নগরী। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রেলগেট দিনের বেশিরভাগ সময় ট্রেন চলাচলের ফলে নিরাপত্তার জন্য বন্ধ থাকে। ফলে শহরের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজট। চিকিৎসা সেবার জন্য এখানে কোনো সরকারি হাসপাতাল পুরোপুরি চালু নেই। শিক্ষার দিক থেকেও হতাশার চিত্র অর্ধশত বছরের সান্তাহার সরকারি কলেজে আজও অনার্স কোর্স চালু হয়নি। অন্যদিকে পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডে নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জনসাধারণের হাঁটার জায়গা বা পার্কের অভাব, বেকারত্ব ও মাদকের ভয়াবহতা সব মিলিয়ে সান্তাহার আজ এক চাপা সম্ভাবনার শহর।
সমাধানের দিকনির্দেশনা; অবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব নয়। কিছু পরিকল্পিত উদ্যোগই পারে এই শহরকে আবারও তার প্রাপ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে। ১. অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন : সান্তাহার বাফার গোডাউন ও পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে বেকারত্ব কমবে, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটবে। ২. শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন : সান্তাহার সরকারি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা এবং ৭নং ওয়ার্ডে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরি। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং শহরের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে। ৩. যানজট নিরসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন : ২নং রেলগেট থেকে মালগুদাম হয়ে পৌঁতা বাইপাস পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা এবং মালগুদামের উত্তর পাশে বাসস্ট্যান্ড স্থাপন করা যেতে পারে। তাছাড়া রেলগেটে আন্ডারপাস বা ট-ষড়ড়ঢ় নির্মাণ করলে শহরের যানজট অনেকটাই নিরসন হবে। ৪. স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ : ২০ শয্যার সরকারি হাসপাতাল দ্রুত চালু করা এবং ঐতিহাসিক রেলওয়ে হাসপাতাল পুনরায় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। এতে স্থানীয় জনগণের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হবে। ৫. পার্ক ও হাঁটার পরিবেশ : জোড়া পুকুরের চারপাশে সার্কুলার রাস্তা ও পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বিনোদনস্থল তৈরি হবে। ৬. মাদকবিরোধী উদ্যোগ : প্রশাসন ও স্থানীয় তরুণ সমাজের অংশগ্রহণে প্রতিটি ওয়ার্ডে অ্যান্টি-ড্রাগ টিম গঠন করা যেতে পারে, যারা সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও নজরদারির মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। নতুন সান্তাহারের প্রত্যাশা ; সান্তাহার শুধু একটি শহর নয়, এটি উত্তরবঙ্গের রেলওয়ে ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। এই শহরকে কেন্দ্র করে একসময় গড়ে উঠেছিল উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্য ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখন সময় এসেছে সেই গৌরব ফিরে আনার। সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকলে সান্তাহার আবারও হয়ে উঠতে পারে উত্তরবঙ্গের আধুনিক রেলনগরী যেখানে ঐতিহ্য ও উন্নয়ন মিলেমিশে নতুন ইতিহাস রচনা করবে।
লেখক
রাকিবুল হাসান
প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








