গাজা উপত্যকা: মানবিক বিপর্যয় ও পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতা

গাজা উপত্যকা: মানবিক বিপর্যয় ও পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতা

বর্তমান সময়ে এসে গাজা উপত্যকা এখন এক মৃতপ্রায় জনপদ। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ বা ‘শান্তি প্রক্রিয়া’ শুরু হলেও, গাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ও মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা সকল অবকাঠামো পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের র‌্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্ট (জউঘঅ) রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে আগামী ১০ বছরে অন্তত ৭১.৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এই বিপুল অর্থ বৈদেশিক সাহায্য ছাড়া গাজার পক্ষে যোগান দেওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। 

গাজার বর্তমান অর্থনীতি এখন কেবল সংকুচিত নয়, বরং পুরোপুরি পঙ্গু। যুদ্ধের ফলে উপত্যকাটির এউচ প্রায় ৮৪% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে গাজার বেশির ভাগ মানুষ কর্মহীন। কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে, ইসরায়েলের বিধিনিষেধের জন্য গাজার জেলেরা পর্যন্ত একটা নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে সাগরে মাছ শিকার করতে পারছে না। যার ফলে গাজার মানুষ স্বল্প মূল্যে আমিষের চাহিদা মিটানোর উৎস থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষের আয় করার তেমন কোনো উৎস আর অবশিষ্ট নেই বললেই চলে। এক সময়ের সচ্ছল কর্মজীবী, ব্যবসায়ী বা উচ্চশিক্ষিত মানুষেরা আজ ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে দিন পার করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এ বছরের শুরুতেই ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছে। বাসস্থান ও অবকাঠামোর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। বাস্তুহারা লাখ লাখ মানুষ এখনও অস্থায়ী তাঁবু বা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে মানবেতর জীবনযাপন করছে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশই হচ্ছে নারী ও শিশু, যারা চরম অনিরাপত্তা এবং মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অস্থায়ী তাঁবুতে ঠাসাঠাসি করে বসবাস করায় সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে গাজার দক্ষিণে খান ইউনিস শহরে একসাথে ৫৪টি জুটির গণবিয়ে সম্পন্ন হয়। যেন নতুন পরিবার গড়ে উঠে এবং মানুষের মাঝে একটু হলেও আনন্দঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। এই রকম ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা গাজার মানুষকে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনতে সাহায্য করবে। গাজায় মৌলিক চাহিদা পূরণের জিনিসপত্র ও দ্রব্যগুলোর সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ, পানি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গাজায় নেই বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। গাজার সড়কগুলো ধ্বংসস্তূপে এমনভাবে অবরুদ্ধ যে, সামান্য দূরত্ব পার হতেও মানুষকে বহু প্রতিবন্ধকতা ও পথ পার হতে হচ্ছে। ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র আরও ভয়াবহ। বেশিরভাগ হাসপাতালের মধ্যে মাত্র কয়েকটি আংশিকভাবে সচল, তারাও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবে রোগাক্রান্ত মানুষকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সংক্রামক রোগ, চর্মরোগ ও পুষ্টিহীনতা এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে। অন্যদিকে, গাজার শিশুরা টানা দুই বছর ধরে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এই যুদ্ধের ফলে গাজার বেশির ভাগ বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছে স্কুলগুলোতে।  

গাজার বহু শিশুই জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে বেশিরভাগ স্কুলভবন এখন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত। গাজায় বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক এনজিও কাজ করলেও তা তাদের সমস্যার সমাধানের প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। এই সংকটের মধ্যে চলমান দুর্ভিক্ষ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয়ের মুখে এক কথায় বলতে গেলে গাজার বাসিন্দারা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সতর্কবার্তা অনুযায়ী দ্রুত বড় পরিসরে মানবিক সহায়তা না পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। 

গাজা পুনর্গঠনের পথে রয়েছে পাহাড়সম বাধাআন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুনর্গঠনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। গাজায় প্রবেশের সীমান্তগুলো এখনও কঠোরভাবে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এর ফলে গাজায় মানবিক সহায়তা ও খাদ্য সামগ্রী কোন কিছুই পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না যা এই সংকটকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস বা ভারী যন্ত্রপাতি আনতে ইসরায়েলের কঠোর বিধিনিষেধ ও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সকল দিক বিবেচনায় গাজা এখন এক পুরোপুরি অবরুদ্ধ জনপদ। গাজা আজ কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগারকে উন্মুক্ত কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। কেবল মানবিক সাহায্য নয়,গাজার টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা। অন্যথায়, ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই জনপদের পুনরুদ্ধার আরও দীর্ঘ, কঠিন এবং পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। 


লেখক :

রিফাত তামান্না হায়া

শিক্ষার্থী ও প্রাবন্ধিক 
বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি অব প্রফেশনাল(বিইউএফ)

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/175044