দিনাজপুরে পাঁচ বছরে বন্ধ দুই তৃতীয়াংশ হাসকিং মিল

দিনাজপুরে পাঁচ বছরে বন্ধ দুই তৃতীয়াংশ হাসকিং মিল

দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি: মেজর অটো রাইস মিলগুলোর সাথে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধানের জেলা দিনাজপুরে বন্ধ হয়ে গেছে শত শত হাসকিং মিল। দিনাজপুর জেলায় মোট ২ হাজার ১৮০টির মধ্যে পাঁচ বছরেই বন্ধ হয়েছে দুই তৃতীয়াংশ হাসকিং মিল। বর্তমানে হাসকিং মিল চালু রয়েছে মাত্র ৭০৩টি।

সরেজমিনে ছোট চালকল মালিক ও শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শ্রমিক ও পুঁজির সংকট, বাজারে চকচকে চালের চাহিদা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা এবং সরকারি নীতিমালার কঠিন শর্তের কারণে টিকতে না পেরে এখন বিলীনের পথে এ শিল্প।

দিনাজপুরের রানীগঞ্জ এলাকার একটি হাসকিং মিলে গিয়ে দেখা যায়, মিলে তেমন ব্যস্ততা নেই। এর উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান জানান, ১৯৯০ সালে গড়ে তোলা এই মিলে আগে ধানের মৌসুমে নারী-পুরুষসহ ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন।

দিন-রাত ধান ভাপানো, শুকানো ও ভাঙানোর কাজ চলত। এখন শ্রমিকসংকটের পাশাপাশি উৎপাদিত লালচে চালের চাহিদাও কম। সরকারিভাবেও এসব মিলের চাল কেনা হচ্ছে না। একই অবস্থা ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলেম উদ্দীনের হাসকিং মিলের। দুই বছর আগেও উৎপাদনে থাকা চাঁদগঞ্জের এ মিল এখন ভুট্টা শুকানোর জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

গত কয়েকদিনে দিনাজপুর সদর, বিরল, বোচাগঞ্জ ও বীরগঞ্জ উপজেলার ১২টি মিল ঘুরে দেখা যায়, চালকলকে কেউ গুদামঘর, কেউবা চাতাল হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন, কেউ আবার ধানের তুষ থেকে গো-খাদ্য তৈরি করছেন, কেউ কেউ চালকলে জ¦ালানি বানাচ্ছেন।

জেলা খাদ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দিনাজপুরে ২ হাজার ১৮০টি হাসকিং মিল চালু ছিল, যা ২০২৫ সালে কমে ৭০৩টিতে নেমে গেছে। তবে চালু থাকা অনেক মিলেও এখন আর উৎপাদন হয় না। কেউ অটো রাইস মিল থেকে চাল কিনে সরকারি গুদামে জমা দিয়ে টিকে আছেন, কেউ লাইসেন্স ভাড়া দিয়েছেন ফড়িয়াদের কাছে।

দিনাজপুরের স্থানীয় খাদ্যগুদামের (এলএসডি) কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি নীতিমালার শর্ত পরীক্ষার জন্য তাদের কাছে কোনো যন্ত্র নেই। তবে দেখতে চকচকে না হলে চাল সংগ্রহ করা হয় না।  এদিকে, হাসকিং মিলগুলোতে ধানের সরবরাহ আগের মতো নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অটো রাইস মিলে চাল দিতে এজেন্ট নিয়োগ করা হয়। তারা কৃষকদের আগাম টাকা দিয়ে ধান কিনে নেয়।

এমনকি কৃষকের গোলায়ও ধান মজুত করে রাখে বড় কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে হাসকিং মিলগুলোর তেমন পুঁজি নেই। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, সারা বছর অটো রাইস মিল চালাতে একধরণের প্রতিযোগিতা চলে। তারা সক্ষমতার তিনগুণ পর্যন্ত ধান মজুত করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নীতিমালা পরিবর্তনের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা হাসকিং মিলগুলোর একটি পুলহাট খোঁয়াড়ের মোড়ের মজিবুর রহমানের মিল। তিন দশক ধরে এ ব্যবসায় আছেন ৭৫ বছর বয়সী এই উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, হাসকিং মিলের চালের ভাত মোলায়েম হয় এবং আট মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। অটো রাইস মিলের চাল দুই মাস পরই পোকায় ধরে, ভাতও শক্ত লাগে। এ কারণে সচেতন ক্রেতারা এখনো তার কাছ থেকে চাল কেনেন।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মারুফ আহমেদ বলেন, হাসকিং মিলের লালচে চালে পুষ্টি ও খনিজ বেশি থাকে। দীর্ঘসময় অতিরিক্ত চকচকে চাল খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ জন্য ভোক্তাদের সচেতন করে তোলা প্রয়োজন।

শুধু হাসকিং নয়, অটো রাইস মিলও সংকটে পড়ছে। জেলা খাদ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে জেলায় অটো রাইস মিল ছিল ৩৪৬টি। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ২২৩টিতে। দিনাজপুরের খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম বলেন, দেশে উৎপাদিত প্রায় চার কোটি টন ধান ছাঁটাই করতে কত মিল প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো জরিপ নেই। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মিল গড়ে ওঠায় অনেকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। ঋণ করে মিল নির্মাণ করলেও পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় অনেকে ঋণখেলাপিও হয়ে গেছেন।

বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারি বলেন, কৃষিঋণের সুবিধা উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা পান না। আগে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও এখন ১৪ শতাংশ সুদ গুণতে হচ্ছে। ফলে মূলধন দিয়েই ব্যাংকঋণ শোধ করতে হচ্ছে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/169081