আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

নাসিমা সুলতানা ছুটু : রক্তে ভেজা সেই ফাল্গুন আবার ফিরে এসেছে। বাতাসে বারুদের ঘ্রাণ নেই ঠিকই, কিন্তু আছে স্বজন হারানোর সেই আদিগন্ত হাহাকার। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যে রাজপথ রফিক-সালাম-বরকত-জব্বারদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই রক্ত আজ মিশে আছে আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি বর্ণমালায়। আজ সেই অমর একুশে। শোক, শ্রদ্ধা আর চেতনার এক মহামিলন দিন।

ভোরবেলা যখন কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছিল, তখন চারদিকে বেজে ওঠে সেই কালজয়ী সুর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ এই সুরের টানেই আজ নগ্ন পায়ে শহীদ মিনারে হাজির হবে শত শত মানুষ।

কারো হাতে একগুচ্ছ শিউলি, কারো হাতে গাঁদা কিংবা রক্তিম গোলাপ। ছোট ছোট শিশুরা বাবার হাত ধরে আসবে বর্ণমালার বীরদের চিনতে। প্রতিটি ফুলের অর্ঘ্য যেন বলছে তোমরা আছ, তোমরা থাকবে আমাদের প্রতিটি স্পন্দনে।

সেদিন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যারা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন, তারা জানতেন না যে তাদের এই আত্মত্যাগ একটি জাতির জন্মের বীজ বপন করছে। সালামের রক্তে শিমুল ফুটেছিল, আর বরকতের রক্তে কৃষ্ণচূড়া। আজ সেই রক্তের ঋণ শোধ করার দিন নয়, বরং সেই ঋণের কথা স্মরণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দিন। ভাষা শহীদদের সেই নীরব আত্মত্যাগই আজ আমাদের বিশ্ব দরবারে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে অনন্য পরিচিতি দিয়েছে।

শহিদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্র-জনতার চোখে আজ শুধু শোক নয়, ছিল দীপ্ত শপথ। অনেকের মতে, একুশ মানে শুধু একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, একুশ মানে প্রতিদিন নিজের ভাষাকে ভালোবাসা। সর্বস্তরে বাংলার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে নিজের সংস্কৃতিকে রক্ষা করাই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।

বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবুল ফজল একুশ নিয়ে তার এক লেখায় লিখেছেন ‘মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি। ন্যায়ের দাবি, সত্যের দাবি এ দাবির লড়াইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির শহিদরা প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, স্বভাবের ব্যাপারে, ন্যায় ও সত্যের ব্যাপারে কোন আপস চলে না, চলে না কোন গোঁজামিল। জীবন-মৃত্যুর ভ্রকুটি উপেক্ষা করেই হতে হয় তার সম্মুখীন।’

আজকের এই দিনটি এখন কেবল বাঙালির নয়, সারা বিশ্বের। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর থেকে বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারি। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতেও যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলার এই জয়জয়কার আজ প্রত্যেক বাঙালির জন্য এক গর্বের অধ্যায়।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/158412